মানুষের শরীরের স্বাভাবিক বার্ধক্যের একটি দৃশ্যমান লক্ষণ হলো চুল পাকা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থের মাত্রা কমে যায়, ফলে ধীরে ধীরে চুল তার স্বাভাবিক কালো রং হারিয়ে ফেলে। এই পরিবর্তনকে অনেকে শুধু বয়সের ছাপ হিসাবে দেখেন, তবে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনির্ভরযোগ্য প্রচারণায় দাবি করা হয়েছে যে—পাকা চুল নাকি শরীরকে ক্যানসার বা অন্যান্য গুরুতর রোগ থেকে রক্ষা করে। এমনকি আরো বলা হয়, যারা অল্প বয়সে চুল পাকায়, তাদের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। কিন্তু এই দাবিগুলো কতটুকু সত্য? বৈজ্ঞানিক গবেষণা কি আসলে এমন কোনো সম্পর্ক প্রমাণ করতে পেরেছে? এই লেখায় আমরা সেই উত্তর খুঁজে দেখব।
চুল পাকার কারণ
প্রথমেই জানা
দরকার,
চুল
পাকার
মূল
কারণ
কী।
চুলে
মেলানিন তৈরি
করে
মেলানোসাইট নামের
বিশেষ
কোষ।
বয়স
বাড়ার
সঙ্গে
সঙ্গে
এসব
কোষ
দুর্বল
হয়ে
পড়ে
এবং
পর্যাপ্ত মেলানিন উৎপাদন
করতে
পারে
না।
ফলে
চুল
ধীরে
ধীরে
সাদা
বা
ধূসর
হয়ে
যায়।
কখনও
কখনও
জিনগত
কারণ,
হরমোনের পরিবর্তন, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, ভিটামিন বি১২–এর ঘাটতি, ধূমপান,
অতিরিক্ত মানসিক
চাপ,
এমনকি
অটোইমিউন রোগের
কারণেও
অকাল
পাকা
দেখা
দিতে
পারে।
অর্থাৎ
চুল
পাকা
একটি
জৈবিক
প্রক্রিয়া, যা
শরীরের
প্রতিরোধ ব্যবস্থার শক্তি
বা
ক্যানসারের ঝুঁকির
সঙ্গে
সরাসরি
কোনো
যোগসূত্র প্রমাণিত নয়।
ইঁদুরের
ওপর করা সেই গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরের মেলানোসাইট স্টেম সেলের ডিএনএ যখন
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন থেমে যেতে পারে
স্থায়ীভাবে। এ রকম হলে চুলের রঙের জন্য দায়ী স্টেম সেল কমে যায়। ফলে চুল রং হারায়।
অর্থাৎ চুল পেকে যায়।
পাকা চুল এবং ক্যানসার প্রতিরোধের মধ্যে সম্পর্ক
কিছু মানুষ
মনে
করেন
যে
পাকা
চুল
শরীরের
ভেতরে
বেশি
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমের ইঙ্গিত
দেয়,
যা
নাকি
ক্যানসারের মতো
রোগ
থেকে
সুরক্ষা দিতে
পারে।
কিন্তু
এখন
পর্যন্ত কোনো
প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাকা
চুল
এবং
ক্যানসার প্রতিরোধের মধ্যে
সরাসরি
সম্পর্ক পাওয়া
যায়নি। বরং
কিছু
গবেষণায় দেখা
গেছে,
যেসব
কারণে
চুল
পাকে
(বিশেষ
করে
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস), সেগুলোর মধ্যেই
ক্যানসারের ঝুঁকি
বাড়ার
সম্ভাবনাও থাকতে
পারে।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মানে
শরীরে
অতিরিক্ত ফ্রি
র্যাডিক্যাল জমা হওয়া, যা
কোষের
ক্ষতি
করে।
এ
ক্ষতিগ্রস্ত কোষ
ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ নানা
রোগের
দিকে
ধাবিত
হতে
পারে।
অর্থাৎ
পাকা
চুল
বরং
কখনও
কখনও
ইঙ্গিত
দিতে
পারে
যে
শরীরে
অক্সিডেটিভ ক্ষতি
হচ্ছে।
তবে
এটাও
নিশ্চিতভাবে বলা
যায়
না,
কারণ
পাকা
চুল
ও
রোগের
সম্পর্ক ব্যক্তিভেদে ভিন্ন
হতে
পারে
এবং
সবসময়
এক
রকম
নয়।
আরেকটি বড়
ভুল
ধারণা
হলো—যাদের অল্প বয়সে
চুল
পাকে,
তারা
নাকি
দীর্ঘায়ু হয়
বা
বড়
রোগ
থেকে
সুরক্ষিত থাকে।
কিন্তু
জিনগত
কারণে
যদি
কারও
পরিবারে অকাল
পাকার
ইতিহাস
থাকে,
তবে
তার
নিজের
ক্ষেত্রেও তা
ঘটতে
পারে।
এটি
মোটেও
ক্যানসার বা
অন্যান্য মারাত্মক রোগের
ঝুঁকি
কমিয়ে
দেয়
না।
অনেক
ক্ষেত্রে অকাল
পাকা
পুষ্টিহীনতা, রক্তাল্পতা, থাইরয়েড সমস্যা,
অটোইমিউন রোগ
বা
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক
চাপেরও
ইঙ্গিত
দেয়।
তাই
এটি
বরং
সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যার সতর্ক
সংকেতও
হতে
পারে,
যা
অবহেলা
করা
উচিত
নয়।
ক্যানসার প্রতিরোধে যেসব বিষয় কার্যকর
ক্যানসার প্রতিরোধে যেসব
বিষয়
সত্যিই
কার্যকর, সেগুলোর সঙ্গে
চুল
পাকার
কোনো
সম্পর্ক নেই।
যেমন—সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম,
নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান
ও
মদ্যপান থেকে
বিরত
থাকা,
পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন গ্রহণ—এসবই বিজ্ঞানসম্মত ও
স্বীকৃত উপায়।
চুল
পাকা
এসবের
কোনোটিই সরাসরি
প্রভাবিত করে
না।
তাই
চুল
পাকা
নিয়ে
অযথা
ভয়
বা
ভুল
ধারণা
রাখার
প্রয়োজন নেই,
আবার
এটিকে
বাড়তি
সুরক্ষা ভাবাও
ভুল।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল
হওয়া
অনেক
তথ্যেই
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
থাকে
না।
মানুষ
সাধারণত সহজ
ব্যাখ্যা বা
দ্রুত
সমাধান
খোঁজে,
তাই
যখন
বলে—“পাকা চুল নাকি
ক্যানসার থেকে
রক্ষা
করে”—তখন তা অনেককে
মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।
কিন্তু
বাস্তবে এসব
দাবির
পিছনে
কোনো
গবেষণালব্ধ সত্যতা
নেই।
বরং
ভুল
তথ্য
বিশ্বাস করলে
প্রকৃত
যে
স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে
তা
উপেক্ষিত হতে
পারে।
টোকিও মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল
ইউনিভার্সিটির গবেষণার ফলাফল
চুল পাকা নিয়ে কতই না দুশ্চিন্তা। বার্ধক্যের দৃশ্যমান ছাপ ধরা হয় একে। যদিও কারও কারও চুল পেকে যায় একটু আগেভাগেই। তবে চুল পাকা নিয়ে জাপানের টোকিও মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে বিস্ময়কর তথ্য।
চুলের রঙের ব্যাপারটা নির্ভর করে
নির্দিষ্ট ধরনের কোষের ওপর। এই কোষের নাম মেলানোসাইট স্টেম সেল। জিনগত কারণ এবং
পারিপার্শ্বিক চাপে এ ধরনের একটি কোষ দুটি ভিন্ন ফলাফলের দিকে যেতে পারে। একটি
ফলাফল হলো বয়সজনিত পরিবর্তন, অন্যটি টিউমার।
এই
টিউমারের নাম মেলানোমা। ত্বকের সব ধরনের ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো এই
মেলানোমা। বলে রাখা ভালো, এখানে পারিপার্শ্বিক চাপ বলতে এমন কিছুর উপস্থিতিকে
বোঝানো হয়, যার জন্য কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেহে তৈরি হওয়া ফ্রি র্যাডিক্যালের
মাত্রা বেড়ে গেলে সেটিও এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার
চুল পাকা
একটি
স্বাভাবিক জৈবিক
প্রক্রিয়া—এটি
আপনার
শরীর
ক্যানসার থেকে
রক্ষা
করছে
এমন
ধারণা
বৈজ্ঞানিকভাবে অবাস্তব। আবার
চুল
পাকা
মানেই
মারাত্মক রোগ
আছে—এটাও সত্য নয়।
সুতরাং
এ
নিয়ে
উদ্বেগ
বা
বিভ্রান্তির কোনো
প্রয়োজন নেই।
বরং
নিজের
জীবনযাপন স্বাস্থ্যসম্মত রাখাই
ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।
চুল
পাকা
হয়তো
বৃদ্ধির স্বাভাবিক চিহ্ন,
কিন্তু
এটি
রোগ
প্রতিরোধের রক্ষাকবচ নয়—এটি মনে রাখাই
বুদ্ধিমানের কাজ।












0 comments:
Post a Comment