চোখের এমন কিছু রোগ আছে, যার লক্ষণ সহজে ধরা পড়ে না। এমন একটি রোগ ‘হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি’। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাঁদের মধ্যে এই রোগ দেখা যায়। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন শুধু হৃদপিণ্ড ও কিডনির জন্য নয়, চোখের জন্যও একটি গুরুতর সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ বেড়ে থাকলে চোখের রক্তনালিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং এই রক্তনালিগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখের ভেতরে থাকা রেটিনা (Retina) নামক পাতলা পর্দাটি আলো ও চিত্র গ্রহণ করে আমাদের দৃষ্টিশক্তি তৈরি করে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালিতে পরিবর্তন ঘটে, যাকে বলা হয় হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি (Hypertensive Retinopathy)।
উচ্চ রক্তচাপে চোখের কেন ক্ষতি
হয়
চোখের পেছনের সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল স্তরের নাম রেটিনা। এর কাজ আলো গ্রহণ করে সেটিকে
স্নায়বিক সংকেতে পরিণত করা। রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে থাকলে রেটিনার
ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলোর দেয়ালে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। কখনও ফেটে রক্তক্ষরণ হতে পারে বা ফ্লুইড জমে
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ থাকলে রেটিনার
স্নায়ুকোষ নষ্ট হয়ে স্থায়ীভাবে দৃষ্টি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায় এবং দেয়াল মোটা হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে
ফেটেও যেতে পারে। এতে
রেটিনায় রক্তপাত, তরল জমা ও কোষের ক্ষতি ঘটে। এর প্রভাবে ধীরে ধীরে রেটিনার
কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, দৃষ্টিশক্তি বাধাপ্রাপ্ত বা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে
পারে। অনেক ক্ষেত্রেই শুরুতে কোনো লক্ষণ না থাকায় রোগী বিষয়টি টের পান না, ফলে রোগ
অজান্তেই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
উচ্চ রক্তচাপে চোখের
ক্ষতি শুধু রেটিনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অপটিক নিউরোপ্যাথি (Optic
Neuropathy) নামক সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে চোখের স্নায়ু
রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস
পেতে পারে। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপ রেটিনাল ভেইন ও আর্টারি
অবস্ট্রাকশন ঘটিয়ে হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা এক চোখে দেখা
বন্ধ হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে
সবচেয়ে জরুরি হলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সঠিকভাবে খাওয়া এবং
জীবনযাপন পরিবর্তন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লবণ কম খাওয়া, সুষম খাদ্যগ্রহণ,
নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, এবং
মানসিক চাপ কমানো—এসব অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
চোখের ক্ষতির উপসর্গ
প্রথমে রোগের কোনো উপসর্গ না-ও থাকতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিতে পারে কিছু উপসর্গ—
♦ দৃষ্টি
ঝাপসা হওয়া বা বিকৃত দেখা।
♦ চোখে
চাপ বা ব্যথা অনুভব।
♦ আলোর
প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি।
♦
চোখে ‘ফ্লোটার’ বা ছোট দাগ দেখা।
♦ হঠাৎ
দৃষ্টিশক্তি হ্রাস।
চোখে কোনো ধরনের ঝাপসা
দেখা, আলো ঝলকানি, চোখে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হলে দ্রুত চোখের বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে
হবে। চোখের পেছনের অংশের পরীক্ষা (ফান্ডাস এক্সামিনেশন) করে রেটিনার ক্ষতির পরিমাণ
জানা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে চোখের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব,
তবে দেরি হলে দৃষ্টি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে।
নির্ণয়
ও চিকিৎসা
ফান্ডোস্কোপি
বা রেটিনা পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করা হয়। অনেক সময় ফ্লুরোসিন এনজিওগ্রাফি বা
অপটিক্যাল কোহেরেন্স টমোগ্রাফি পরীক্ষাও করা হয়ে থাকে। চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
♦ নিয়মিত রক্তচাপ মাপা ও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন।
♦
লবণ ও চর্বি কম খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা।
♦
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা।
♦ পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা।
উপসংহার
সর্বোপরি, উচ্চ রক্তচাপ
একটি “নীরব ঘাতক”। এটি শুধু হৃদয় নয়, চোখকেও নীরবে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই
নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন, ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করুন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন।
সচেতন থাকুন, আপনার চোখকে রাখুন সুস্থ ও দৃষ্টিসম্পন্ন।














