ওভারিান ক্যান্সার নারীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনঘাতী রোগ, যা বিশ্বজুড়ে বহু নারীকে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত করছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরও এই রোগকে “নীরব ঘাতক” বলা হয়। কারণ, প্রাথমিক অবস্থায় এই ক্যান্সারের তেমন কোনও স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না বা দেখা গেলেও তা এতটাই সাধারণ ও অস্পষ্ট যে রোগীরা সেগুলোকে সাধারণ শারীরিক সমস্যা ভেবে অবহেলা করে থাকেন। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগটি ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, যখন এটি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে।
ওভারিান ক্যান্সার কী?
নারীর
শরীরে দুই পাশে দুটি ডিম্বাশয় বা ওভারি থাকে, যা ডিম্বাণু উৎপাদন করে এবং হরমোন
নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই ডিম্বাশয়ের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে ও
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে তা টিউমার তৈরি করে। টিউমার যদি ক্যান্সারজাত হয়,
তবে সেটিই ওভারিান ক্যান্সার। বিভিন্ন ধরণের ওভারিান ক্যান্সার রয়েছে,
যেমন—এপিথেলিয়াল ওভারিান ক্যান্সার, জার্ম সেল টিউমার, স্ট্রোমাল টিউমার ইত্যাদি।
এর মধ্যে এপিথেলিয়াল ধরণের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
ওভারিান ক্যান্সার কিভাবে হয়
নারীদের ডিম্বাশয়ে এ ধরনের ক্যান্সারের উৎপত্তি,এটি নারীদের প্রজননতন্ত্রের অংশ, যা ডিম্বাণু তৈরি করে এবং নারীর হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন উৎপাদন করে থাকে। কোনো কারণে যদি ডিম্বাশয়ের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে টিউমার তৈরি করে, তখন তা ওভারিয়ান ক্যান্সারে পরিণত হয়।
পরিসংখ্যান
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওভারিয়ান ক্যান্সার রোগীদের চিত্র বেশ আলাদা। কারণ সচেতনতা অভাব।
এই রোগ শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং দক্ষ লোকবলের ঘাটতিও রয়েছে।
► সারা বিশ্বে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারে মৃত্যুর এটি অন্যতম প্রধান কারণ।
► প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হয় এবং প্রায় দুই লাখ রোগীর মৃত্যু ঘটে।
► উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ায় মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।
► বাংলাদেশের ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওভারিয়ান ক্যান্সারের স্থান তৃতীয়।
এর আগে আছে স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার।
► দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুহার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।
► জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০২০ সালের ক্যান্সার রেজিস্ট্রি অনুযায়ী, ডিম্বাশয় ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে।
বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কারণে এই ক্যান্সারে মৃত্যুহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
ওভারিান ক্যান্সারকে নীরব ঘাতক বলা হয় কেন?
১.
প্রাথমিক লক্ষণ অস্পষ্ট: প্রথম অবস্থায় ওভারিান
ক্যান্সারের লক্ষণগুলো অতিরিক্ত গ্যাস, পেটফাঁপা, বদহজম, হালকা পেটব্যথা, খিদে কমে
যাওয়া কিংবা দ্রুত পেট ভরে যাওয়ার মতো সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। তাই অনেক
নারীই প্রথমে এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেন না।
২.
পরীক্ষার মাধ্যমে সহজে শনাক্ত
করা যায় না:
ব্রেস্ট ক্যান্সার বা সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের মতো ওভারিান ক্যান্সারের কোনও সহজ
স্ক্রিনিং টেস্ট এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আলট্রাসনোগ্রাম বা রক্তপরীক্ষা CA-125
অনেক সময় সাহায্য করলেও তা শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয়।
৩.
দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে: ওভারি শরীরের গভীরে অবস্থিত
হওয়ায় টিউমার ধীরে ধীরে বড় হলেও তা সহজে বোঝা যায় না। ফলে ক্যান্সারটি পেটের
অন্য অঙ্গ যেমন ইউটেরাস, ফ্যালোপিয়ান টিউব, লিভার কিংবা অন্ত্র পর্যন্ত ছড়াতে
পারে।
৪.
ব্যথা বা দৃশ্যমান উপসর্গ
দেরিতে দেখা দেয়:
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা বা তীব্র অস্বস্তি থাকে না। যখন ব্যথা শুরু হয়, তখন
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি মধ্য বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এই
সব কারণেই ওভারিান ক্যান্সারকে নীরব ঘাতক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ওভারিান ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণ
যদিও
প্রত্যেক নারী এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, তবুও কিছু নির্দিষ্ট কারণ ঝুঁকি
বাড়িয়ে দেয়—
·
বয়স: ৫০ বছরের পর নারীদের ঝুঁকি বেশি।
·
পারিবারিক
ইতিহাস: মা
বা বোনের ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি দ্বিগুণ।
·
জেনেটিক
মিউটেশন:
বিশেষ করে BRCA1 ও BRCA2 জিনের ত্রুটি।
·
বাত্সরিক
সমস্যা:
দীর্ঘদিন অনিয়মিত ঋতুচক্র বা সন্তান না হওয়া।
·
হরমোন
থেরাপি:
দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ সেবন।
·
স্থূলতা
বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী?
যদিও
লক্ষণগুলো অস্পষ্ট, তবুও কিছু উপসর্গ বারবার দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়—
·
পেটে
ফাঁপা বা ফুলে যাওয়া
·
অল্প
খেয়েই পেট ভরে যাওয়া
·
তলপেটে
চেপে থাকা ব্যথা
·
চিরাচরিত
বদহজম
·
ওজন
হঠাৎ কমে যাওয়া
·
ঘন
ঘন প্রস্রাবের চাপ
·
কোষ্ঠকাঠিন্য
·
মাসিক
অনিয়ম
·
যৌনমিলনে
ব্যথা
যদি
এসব উপসর্গ সপ্তাহে ৩–৪ দিন পরপর হয় এবং এক--দুই সপ্তাহ থাকে, তবে অবশ্যই
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ওভারিান ক্যান্সার নির্ণয়
ডিম্বাশয় ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়ে থাকে :
পেলভিক পরীক্ষা : একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ নারীর তলপেটের কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার জন্য শারীরিক পরীক্ষা করেন।
আলট্রাসনোগ্রাম : শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে ডিম্বাশয়ের ছবি তৈরি করে,টিউমার বা অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা যায়। পেটের ভেতরে পানি (অ্যাসাইটিস) আছে কি না, তা-ও জানা যায়।
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই : ডিম্বাশয় ও এর আশপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিস্তারিত চিত্র
সরবরাহ করে। ক্যান্সার কত দূর ছড়িয়েছে, সেটির ধারণা পাওয়া যায়। এ ছাড়া ক্যান্সারের
পর্যায় (স্টেজ) নির্ধারণ করা সম্ভব।
রক্ত পরীক্ষা : ডিম্বাশয়ে
ক্যান্সার হলে রক্তে উচ্চমাত্রায় পাওয়া যায় সিএ-১২৫ প্রোটিন। মাত্রা মেপে রোগের প্রগতি
ও চিকিৎসা চলাকালে এর অবস্থা মূল্যায়ন করা যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেহে ক্যান্সার
হলেও সিএ-১২৫ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকতে পারে।
হিস্টোপ্যাথলজি : ডিম্বাশয়ের টিস্যু সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে বিশ্লেষণ করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা যায়,সাধারণত কোর বায়োপসি বা এফএনএসি পরীক্ষা না করে অস্ত্রোপচারের পর টিস্যু থেকে নির্ণয় করা হয় ওভারিয়ান ক্যান্সার।
এই
পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের ধরণ, স্টেজ ও ছড়িয়ে পড়ার মাত্রা নির্ধারণ করা
যায়।
ওভারিান ক্যান্সারের চিকিৎসা
চিকিৎসার
ধরন নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, ক্যান্সারের স্টেজ ও টিউমারের প্রকৃতির ওপর। সাধারণত
নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হয়—
১. অস্ত্রোপচার (Surgery)
এটি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান
টিউব, ইউটেরাস এবং আক্রান্ত অংশগুলো অপসারণ করা হয়। উন্নত পর্যায়ে পেটের অন্যান্য
অংশ থেকেও ক্যান্সার অপসারণ করা হতে পারে।
২. কেমোথেরাপি
অস্ত্রোপচারের
আগে বা পরে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। ক্যান্সারের কোষগুলিকে ধ্বংস করতে এটি অত্যন্ত
কার্যকর।
৩. টার্গেটেড থেরাপি
নির্দিষ্ট
জিন বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে এ থেরাপি কাজ করে। BRCA মিউটেশন থাকলে PARP inhibitor
খুব কার্যকর।
৪. হরমোন থেরাপি
কিছু
বিশেষ ধরণের ওভারিান ক্যান্সারে হরমোন থেরাপি ব্যবহৃত হয়।
৫. ইমিউনোথেরাপি
শরীরের
নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করাতে এটি
সাহায্য করে।
ওভারিান ক্যান্সারের প্রতিকার বা প্রতিরোধ
যদিও
সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায় না, তবুও কিছু পদক্ষেপ ঝুঁকি
কমাতে সাহায্য করতে পারে—
1. সন্তান ধারণ ও স্তন্যদান: গবেষণায় দেখা গেছে যে যেসব নারীর
সন্তান আছে এবং স্তন্যদান করেছেন, তাদের ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম।
2. পিল সেবন: কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শে
জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল সেবন ঝুঁকি কমাতে পারে।
3. সুস্থ জীবনযাপন: সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম,
ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানমুক্ত জীবন যাপন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
4. পারিবারিক ইতিহাস থাকলে জেনেটিক পরীক্ষা: যাদের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস
আছে, তারা BRCA জিন পরীক্ষা করাতে পারেন।
5. নিয়মিত গাইনোকলজিক চেক-আপ: লক্ষণ না থাকলেও বছরে অন্তত একবার
নারীদের নারী-রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা করা উচিত।
উপসংহার
ওভারিান
ক্যান্সার সত্যিই একটি নীরব ঘাতক—কারণ এটি দীর্ঘদিন দেহে লুকিয়ে থাকে এবং প্রথম
পর্যায়ে খুব কম লক্ষণ দেখা যায়। তবে সুখবর হলো—সময়মতো শনাক্ত হলে চিকিৎসা সফল
হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এজন্য নারীদের উচিত নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকা,
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত
চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সচেতনতা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয়ে
ওভারিান ক্যান্সারকে পরাস্ত করা সম্পূর্ণ সম্ভব।












0 comments:
Post a Comment