কোমর ব্যথা বা লোয়ার ব্যাক পেইন (Lower Back Pain) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা, যা পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে হতে পারে কোমর ব্যথা। বয়সজনিত হারক্ষয় রোগের পাশাপাশি পেশিতে টান অথবা স্নায়বিক সমস্যা থেকেও এটি হতে পারে। এটি অনেক সময় মেরুদণ্ডের (Spine) সমস্যা থেকে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে এটি দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে এবং মানসিক চাপও সৃষ্টি করে।
মেরুদণ্ড থেকে কোমর ব্যথা কেন হয়?
কোমরের মেরুদণ্ডে (Lumbar
Spine) থাকে হাড়, ডিস্ক, স্নায়ু, পেশী ও লিগামেন্ট। এই অংশে যেকোনো পরিবর্তন, ক্ষয়
বা আঘাত থেকে ব্যথা হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো।
১.
ডিস্ক স্লিপ বা হার্নিয়েটেড ডিস্ক (Herniated
Disc) : মেরুদণ্ডের
হাড়ের মাঝের নরম ডিস্ক বাইরে বেরিয়ে স্নায়ুতে চাপ দিলে পিঠ ও পায়ে তীব্র ব্যথা হয়।
মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মধ্যকার
সন্ধিতে থাকে নরম ডিস্ক। কিছু ক্ষেত্রে আঘাত পেয়ে অথবা মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপজনিত
কারণে ডিস্কগুলো এক পাশে ফুলে যেতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে ফেটে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ডের অন্যান্য স্নায়ুতে চাপ পড়ে,
যার ফলে শুরু হয় কোমর ব্যথা।
২. স্পন্ডিলোসিস (Spondylosis) : বয়সজনিত কারণে হাড় ও জয়েন্ট ক্ষয়ে মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে যায়, যা ব্যথার অন্যতম কারণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলো দুর্বল হয়ে যায়। তরুণ বয়সের মতো আর কোমর বা মেরুদণ্ডের হাড়কে সাপোর্ট দিতে পারে না। এর ফলে কোমর ব্যথা দেখা দেয়।
৩. সায়াটিকা (Sciatica) : মেরুদণ্ডের নিচের অংশ থেকে বের হওয়া সায়াটিক নার্ভে চাপ পড়লে কোমর থেকে পায়ের দিকে ঝিনঝিনে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে।
৪. মাংসপেশীর টান বা আঘাত : অতিরিক্ত ভার উত্তোলন, হঠাৎ ঘোরানো বা বসার ভুল ভঙ্গির কারণে পেশীতে টান লেগে ব্যথা হয়।
৫. স্পাইনাল স্টেনোসিস (Spinal Stenosis) : মেরুদণ্ডের ভেতরের জায়গা সংকীর্ণ হয়ে স্নায়ু চাপে গেলে দাঁড়ানো বা হাঁটার সময় ব্যথা বেড়ে যায়। মেরুদণ্ডের হাড়গুলো যদি নির্দিষ্ট স্থান থেকে সরে যায়, সে ক্ষেত্রে স্নায়ুতে চাপ পড়ে এবং কোমরে ব্যথা হয়।
৬.
অ্যাক্সিয়াল স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিস : এই রোগটি মেরুদণ্ড ও পেলভিসে প্রদাহ সৃষ্টি
করে।
এর দুটি ধরন আছে—
► নন-রেডিওগ্রাফিক, এ ধরনের
প্রদাহ সাধারণত এক্স-রে রিপোর্টে দেখা যায় না।
► অ্যানকাইলোজিং
স্পন্ডাইলাইটিস, যা এক্স-রেতে দেখা যায় এবং তীব্র ব্যথা হয়।
৭. অস্টিওপোরোসিস : মেরুদণ্ড ও পেলভিসের হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর
হয়ে গেলে অনেক সময় মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে। একে বলে অস্টিওপোরোসিসজনিত
কোমর ব্যথা।
৮. স্পাইনাল স্টেনোসিস : মেরুদণ্ডের ভেতরের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেলে স্নায়ুতে
পড়ে বাড়তি চাপ। এতে কোমরে ব্যথার পাশাপাশি পায়ে অবশ বা রিনঝিন অনুভূতির পাশাপাশি দুর্বলতাও
দেখা দিতে পারে।
৯. মেরুদণ্ডের গঠনজনিত অস্বাভাবিকতা : মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়া (স্কোলিওসিস) বা কোমর অতিরিক্ত
বাঁকানো (লর্ডোসিস) থেকেও কোমর ব্যথা হতে পারে।
১০. মেরুদণ্ডে সংক্রমণ : যদিও বিরল, তবে মেরুদণ্ডে জীবাণুর সংক্রমণ
হলে জ্বর, কাঁপুনি ও মাথা ব্যথার সঙ্গে কোমরে ব্যথা দেখা দেয়।
১১. ভার্টিব্রোজেনিক ব্যথা : মেরুদণ্ডের হাড়ের (Vertebrae) ভেতরের অংশে চাপ
বা ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুর কারণে এ ধরনের ব্যথা হয়।
১২. অন্যান্য কারণ : দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার ক্ষেত্রে এই ব্যথা হতে পারে, স্থূলতার (অতিরিক্ত ওজন) কারণেও হতে পারে, ঘুম কম/বেশি হলে, হাই হিল পরার কারণেও হতে পারে, দুর্ঘটনা বা হাড় ভাঙার কারণেও হতে পারে, তাছাড়া শরীরে প্রদাহ বা সংক্রমণ রজার কারণেও এই ব্যথা হতে পারে।
কোমর ব্যথা উপশমে করণীয়
ব্যথার ধরন ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা
ভিন্ন হয়। স্বল্পমেয়াদি কোমর
ব্যথায় সাধারণত চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, সময়ের সঙ্গে বাড়লে
অথবা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এক্স-রে বা এমআরআই
করানোর পরামর্শ দিতে পারেন চিকিৎসক। ব্যথা উপশমে করণীয়— প্রাথমিক
পর্যায়ে নিচের পদক্ষেপগুলো খুব কার্যকর হতে পারে।
১. বিশ্রাম ও সঠিক ভঙ্গি
বজায় রাখা
·
দীর্ঘক্ষণ
এক ভঙ্গিতে বসে থাকবেন না।
·
সোজা
হয়ে বসুন ও চেয়ার এমনভাবে ব্যবহার করুন যাতে কোমর সাপোর্ট পায়।
·
ভারি
বস্তু তুলতে হাঁটু ভাঁজ করে তুলুন, কোমর না বাঁকান।
২. গরম বা ঠান্ডা সেঁক
·
তীব্র
ব্যথায় প্রথমে ঠান্ডা
সেঁক ও পরবর্তীতে গরম সেঁক দিলে পেশী শিথিল হয় এবং ব্যথা কমে।
৩. হালকা ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি
·
চিকিৎসকের
পরামর্শে স্ট্রেচিং
ও ব্যাক এক্সারসাইজ
করলে পেশী মজবুত হয়।
·
ফিজিওথেরাপি ব্যথা কমাতে ও মেরুদণ্ড সোজা রাখতে
সাহায্য করে।
·
হালকা ব্যায়াম ও
ফিজিওথেরাপি মেরুদণ্ডের পেশি শক্ত করে, নমনীয়তা বাড়ায় এবং ব্যথা কমায়।
৪. ওষুধ সেবন
·
প্রয়োজন
অনুযায়ী ব্যথানাশক, মাংসপেশী শিথিলকারী ও প্রদাহনাশক ওষুধ সেবন করা হয়।
·
চিকিৎসকের
পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
·
চিকিৎসকের পরামর্শে
ব্যথানাশক বা প্রদাহনাশক ওষুধ (NSAID) খাওয়া যেতে পারে।
৫. জীবনধারার পরিবর্তন
·
নিয়মিত
হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়াম করুন।
·
ওজন
নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
·
পর্যাপ্ত
পানি পান ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন।
৬.
ওজন নিয়ন্ত্রণ : দেহের অতিরিক্ত ওজন মেরুদণ্ড ও কোমরে চাপ
ফেলে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
৭. সুষম খাদ্য : মাছ, শাক-সবজি, দুধজাতীয় খাবার থেকে পর্যাপ্ত
ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও ফসফরাস পাওয়া যায়, যা হাড় মজবুত রাখে।
কখন অস্ত্রোপচার প্রয়োজন?
সব কোমর ব্যথার চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার
দরকার হয় না। তবে নিচের পরিস্থিতিতে সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
1.
ডিস্ক
স্লিপ বা স্পাইনাল স্টেনোসিসে স্নায়ু চাপে পা অবশ হয়ে যাওয়া বা দুর্বলতা আসা।
2.
ওষুধ
ও ফিজিওথেরাপি নিয়েও ৬–৮ সপ্তাহ পর ব্যথা না কমা।
3.
প্রস্রাব
বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেওয়া (Cauda Equina Syndrome)।
4.
দাঁড়ানো
বা হাঁটা একেবারে কষ্টকর হয়ে পড়া।
অস্ত্রোপচারের
সাধারণ ধরণগুলো হলো:
·
Microdiscectomy – স্লিপড ডিস্ক থেকে চাপ মুক্ত করা
·
Laminectomy – স্পাইনাল স্টেনোসিসে জায়গা বাড়ানো
·
Spinal
Fusion – ক্ষতিগ্রস্ত
হাড় যুক্ত করে স্থিতিশীলতা আনা
প্রতিরোধমূলক পরামর্শ
·
প্রতিদিন
অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন
·
দীর্ঘক্ষণ
বসে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট হাঁটুন
·
সঠিকভাবে
ভার উত্তোলন করুন
·
পর্যাপ্ত
ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
উপসংহার
মেরুদণ্ডজনিত কোমর ব্যথা অবহেলা
করা উচিত নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
অস্ত্রোপচার ছাড়াই সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ সম্ভব। তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা পায়ে অবশভাব
দেখা দিলে অর্থোপেডিক
বা নিউরো সার্জনের
পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেকে মনে করেন কোমর ব্যথা
গুরুতর রোগ নয়। ঘরোয়া পদ্ধতিতে চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন। মনে রাখতে হবে, ব্যথা মেরুদণ্ডের
গুরুতর সমস্যা থেকেও হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের
পরামর্শ নিন।









0 comments:
Post a Comment