কোলন ক্যান্সার বা বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার হলো এমন একটি রোগ, যেখানে কোলনের ভেতরের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে ক্যান্সার বা টিউমারে রূপ নেয়। সাধারণত এটি কোলনের ভেতরের পলিপ (ছোট গুটি)-এর মাধ্যমে শুরু হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কোলন ক্যান্সারকে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেডিকেল বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যান্সারের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি। ৩০–৪০ বছরের মানুষদের মধ্যেও এখন এই ক্যান্সার ধরা পড়ছে—যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।
এই পরিবর্তন কেন হচ্ছে?
কেন তরুণরা এমন এক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা আগে ছিল মূলত বয়স্কদের রোগ? এই
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কোলন ক্যান্সার কী?
মানুষের পরিপাকতন্ত্রের
একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কোলন বা বৃহদান্ত্র। খাবার হজম হওয়ার পর অবশিষ্টাংশ
কোলনে প্রবেশ করে, যেখানে পানি শোষিত হয় এবং শেষে মলের আকারে নির্গত হয়। কোলনের
ভেতরের স্তরের কোষগুলো যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে শুরু করে, তখনই কোলন ক্যান্সার
সৃষ্টি হয়।
কোলন ক্যান্সারের
প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত খুব হালকা থাকে—যেমন পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা
ডায়রিয়া, ওজন কমে যাওয়া, মলে রক্ত দেখা ইত্যাদি। এগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভাবা হয়,
ফলে রোগ অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। তাই সচেতনতা ও নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যান্সার কেন বাড়ছে?
শরীরচর্চায় অনীহা, অতিরিক্ত পরিমাণ চিনিসমৃদ্ধ, চর্বিজাতীয় ও প্রক্রিয়াজাত
খাবার গ্রহণ, লাল মাংস খাওয়া, খাবারের তালিকায় সবজি, ফল ও ফাইবারের ঘাটতি, বংশগত
বৈশিষ্ট্য, ডায়াবেটিস, এক্রোমেগালি নামের হরমোনের ব্যাধি, পিত্তথলি অপারেশন, কোলনের
পলিপ বা অন্যান্য রোগ, যেমন—ক্রোনস ডিজিস, আলসারেটিভ কলাইটিস, ছোটবেলায় অন্ত্রে
ইসকেরেশিয়া কলাই নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। এটি অন্ত্রে কলিব্যাকটিন নামের
রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। একসময় এই যৌগ কোলনের কোষকে উদ্দীপ্ত করে অনিয়ন্ত্রিত কোষ
গঠনে ভূমিকা নেয়।
তরুণদের মধ্যে কোলন
ক্যান্সার বাড়ার পেছনে বেশ কিছু জীবনধারা, পরিবেশগত ও জিনগত কারণকে দায়ী মনে করা
হয়। গবেষণা এখনো চলছে, তবে যে কারণগুলো সবচেয়ে বেশি চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো নিচে
তুলে ধরা হলো—
১. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (Processed food &
fast food culture)
তরুণদের খাদ্যাভ্যাস গত
দশকগুলোর তুলনায় ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত
খাবার, ফাস্ট ফুড, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, লাল মাংস, ফ্রাইড আইটেম এবং চিনিযুক্ত
পানীয়ের পরিমাণ অনেক বেশি।
এই ধরনের খাবারগুলো—
·
কোলনের
প্রদাহ বাড়ায়
·
ভালো
ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমায়
·
অন্ত্রে
টক্সিন বৃদ্ধি করে
·
ফাইবারের
ঘাটতি সৃষ্টি করে
ফলাফল হিসেবে কোলনের
কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. ফাইবার কম খাওয়া
ফাইবার বা আঁশ কোলন সুস্থ
রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান। কিন্তু আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে ফাইবারযুক্ত খাবার—যেমন
সবজি, ফল, ডাল, ওটস, গোটা শস্য—খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে।
ফাইবার কম খেলে—
·
অন্ত্রের
গতি ধীর হয়
·
মল
জমে থাকে এবং কোলনে চাপ সৃষ্টি করে
·
কোলনের
কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এতে কোলনের ভেতর ক্ষতিকর
রাসায়নিক জমে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩. স্থবির জীবনধারা — কম শারীরিক পরিশ্রম
তরুণদের একটি বড় অংশ এখন
অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করে, আবার বাইরে হাঁটা বা ব্যায়াম করাও কমে গেছে।
কম শারীরিক পরিশ্রম—
·
ওজন
বৃদ্ধি ঘটায়
·
ইনসুলিন
রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়
·
অন্ত্রে
রক্তপ্রবাহ কমায়
·
প্রদাহ
বাড়ায়
এসবই কোলন ক্যান্সারের
ঝুঁকি বাড়ানোর জন্য দায়ী।
৪. অস্বাভাবিক স্থূলতা (Obesity)
স্থূলতা এখন তরুণদের
মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি।
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে
থাকলে—
·
হরমোনের
ভারসাম্য নষ্ট হয়
·
ইনসুলিনের
মাত্রা বাড়ে
·
ক্রনিক
(দীর্ঘস্থায়ী) প্রদাহ সৃষ্টি হয়
এই অবস্থাগুলো কোলনের
কোষগুলোকে ক্যান্সারে পরিণত হওয়ার রাস্তা সহজ করে দেয়।
৫. অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার
অনেক গবেষক মনে করেন যে
যেসব দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি, সেখানে তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যান্সারের
হারও বেশি।
অ্যান্টিবায়োটিক—
·
অন্ত্রের
ভালো ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে
·
অন্ত্রের
স্বাভাবিক পরিবেশ পরিবর্তন করে
·
রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে
ফলে কোলন ক্যান্সারের
ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৬. ঘুমের অভাব ও মানসিক চাপ
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা,
রাত জাগা, স্ক্রিন টাইম বৃদ্ধি এবং মানসিক চাপ তরুণদের একটি বড় সমস্যা।
ঘুমের অভাব ও স্ট্রেস—
·
হরমোন
গঠন ব্যাহত করে
·
প্রতিরোধ
ক্ষমতা দুর্বল করে
·
শরীরের
প্রদাহ বাড়ায়
এই পরিবর্তনগুলো কোলন
ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্রনিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৭. জিনগত কারণ ও পারিবারিক ইতিহাস
কিছু তরুণদের ক্ষেত্রে
জিনগত মিউটেশন বা পরিবারে কোলন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই
বেশি থাকে। বিশেষ করে Lynch
syndrome বা
Familial Adenomatous
Polyposis (FAP)
থাকলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
তবে উদ্বেগের বিষয়
হলো—অধিকাংশ তরুণ রোগীর ক্ষেত্রে কোনো পারিবারিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। অর্থাৎ
জীবনধারা ও পরিবেশগত কারণই বড় ভূমিকা রাখছে।
৮. অ্যালকোহল ও ধূমপান
অনেক তরুণ বয়স থেকেই
ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ শুরু করেন, যা কোলনের কোষের DNA নষ্ট করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
৯. দীর্ঘসময় বসে থাকা (Sedentary lifestyle)
প্রযুক্তির কারণে তরুণদের
মাঝে "চেয়ার-লাইফস্টাইল" খুব প্রচলিত।
একটানা কয়েক ঘণ্টা বসে থাকলে—
·
অন্ত্রে
চাপ পড়ে
·
রক্তপ্রবাহ
কমে
·
হজম
কম সক্রিয় হয়
·
প্রদাহ
বাড়ে
এই পরিবর্তনগুলো কোলন
ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন—সারসংক্ষেপ
তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যান্সারের
বৃদ্ধি একাধিক কারণের সমন্বয়ে ঘটছে—
·
প্রক্রিয়াজাত
খাবার বেশি খাওয়া
·
ব্যায়ামের
অভাব
·
স্থূলতা
·
অ্যালকোহল
ও ধূমপান
·
অতিরিক্ত
অ্যান্টিবায়োটিক
·
রাতে
জাগা ও মানসিক চাপ
·
পরিবেশ
দূষণ
·
জিনগত
কারণ
এই সবগুলো মিলে তরুণদের
শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে, হরমোনে পরিবর্তন ঘটায় এবং কোলনের সুস্থ
কোষগুলোকে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।
খাবারের ভূমিকা
কোলন ক্যান্সার সৃষ্টিতে খাবারের রয়েছে
তিনটি ভূমিকা :
রাসায়নিক তৈরি : চর্বিজাতীয় খাবার রান্না করলে তৈরি হয়
ক্যান্সার তৈরির রাসায়নিক অ্যামাইন।
পাশাপাশি চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণের
ফলে পিত্তনালি থেকে প্রচুর পরিমাণ পিত্ত এসিড নিঃসরিত হয়। ফলে মলের মধ্যে ফ্যাটি
এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এটিও ক্যান্সারের কারণ।
টক্সিন জমে যাওয়া : শাক-সবজি কম খেলে দেহে ফাইবারের ঘাটতি তৈরি
হয়। শাক-সবজি শরীরের জন্য খুবই উপকারী।
অন্ত্রে মলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, শক্ত
করে এবং প্রবাহে গতি দান করে। ফলে খাদ্যের অপদ্রব্যগুলো দীর্ঘ সময় কোলনে জমা থাকতে
পারে না। ফাইবার গ্রহণ কম করলে মল দীর্ঘ সময় কোলনে জমে থাকে, এতে ক্যান্সারের
ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রতিরোধক ভিটামিন : ভিটামিন এ, সি ও ই-এর পাশাপাশি ফ্লাভিনয়েড
নামের একটি উপাদান কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এগুলোর মূল জোগান দেয়
সবজি ও ফল। অতিরিক্ত পিত্তরসের ক্ষতিকর প্রভাব কমায় ক্যালসিয়াম, ফলে এটিও কোলন
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস দুধ। ফলিক এসিড ও
ওমেগা-৩ ডিএনএর ক্ষয় রোধ করে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। এ দুটি উপাদান রয়েছে
মাছে, বিশেষত সামুদ্রিক মাছের তেলে।
কিভাবে ঝুঁকি কমানো যায়
তরুণদের কোলন ক্যান্সারের
হার কমাতে নিচের পদক্ষেপগুলো কার্যকর—
· নিয়মিত ব্যায়াম
·
ফাইবারসমৃদ্ধ
খাবার খাওয়া
·
ফাস্ট
ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
·
পর্যাপ্ত
ঘুম
·
মানসিক
চাপ নিয়ন্ত্রণ
·
ধূমপান
ও অ্যালকোহল পরিহার
·
স্বাস্থ্যকর
ওজন বজায় রাখা
·
অন্তত
৪০ বছরের পর স্ক্রিনিং করানো (ঝুঁকি থাকলে আরও আগে)
চিকিৎসা
প্রাথমিক পর্যায়ে কোলন ক্যান্সার ধরা
পড়লে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি।
কিন্তু ক্যান্সার অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দাঁড়ায় শতকরা ৫
ভাগেরও কম। সুতরাং ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
অস্ত্রোপচার, কেমো ও ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়।
উপসংহার
কোলন ক্যান্সার আগে শুধুই
বয়স্কদের রোগ ছিল—এ ধারণা এখন আর সত্য নয়। আধুনিক জীবনধারা, অস্বাস্থ্যকর
খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, স্থূলতা এবং নানা পরিবেশগত কারণে তরুণদের মধ্যেও কোলন
ক্যান্সারের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। তবে সুখবর হলো—সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত
ব্যায়াম এবং সময়মতো চিকিৎসা পরীক্ষা এই ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। তাই সমস্যা দেখা
দেওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে মনোযোগ দিন। সুস্থ কোলন, সুস্থ
জীবন—আপনার হাতে।












0 comments:
Post a Comment