বয়স ও অন্যান্য কারণে হাড় ক্ষয়ে দুর্বল হয়ে যায়, এ রোগটির নাম অস্টিওপোরোসিস। এটি সাধারণত প্রবীণদের হয়ে থাকে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি।
অস্টিওপোরোসিস হলো একটি
নীরব কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক হাড়ের রোগ, যা ধীরে ধীরে দেহের হাড়কে দুর্বল, ভঙ্গুর
ও ক্ষয়প্রাপ্ত করে তোলে। সাধারণ ভাষায় একে হাড় ক্ষয় বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা,
যেখানে শরীরের হাড়ের ঘনত্ব বা ঘনত্বের মান (Bone Mineral Density) ক্রমশ কমতে
থাকে। ফলে হাড়ের গঠন ভিতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায় এবং খুব সামান্য চাপ বা আঘাতেও সহজে
ভেঙে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ৫০ বছরের
বেশি বয়সী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন
অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পুষ্টিহীনতা ও
স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবে এই রোগের প্রাদুর্ভাব আরও বেশি দেখা যায়।
প্রতিবছর ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস
ফাউন্ডেশন পালন করে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। বিশ্বের প্রতিটি ব্যক্তিকে হাড়ের
স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন করা এ দিবসের লক্ষ্য। এ বছরে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য, ‘It’s
Unacceptable!’ অর্থাৎ অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসা ও সচেতনতায় কোনো প্রকার ঘাটতি
গ্রহণযোগ্য নয়।
কি কারণে অস্টিওপোরোসিস
বা হাড় ক্ষয় রোগ হয়
অস্টিওপোরোসিসের প্রধান
কারণ হলো শরীরে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
শরীরে হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর
ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ইস্ট্রোজেন হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সাহায্য
করে, তাই এর ঘাটতি হলে হাড় দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও বয়স বৃদ্ধির
ফলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গিয়ে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া, পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়া, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, শারীরিক পরিশ্রমের
ঘাটতি, ধূমপান ও মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি অনেকগুণ
বাড়িয়ে তোলে।
অস্টিওপোরোসিসকে অনেক সময়
“নীরব চোর” বলা হয়, কারণ এটি ধীরে ধীরে শরীরের হাড় ক্ষয় করে দেয়, অথচ রোগী তা টেরই
পান না। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ না থাকলেও পরবর্তী সময়ে মেরুদণ্ড
বাঁকা হয়ে যাওয়া, কোমরে ব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া, দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার সময়
ব্যথা অনুভব করা এবং সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া — এসব লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময়
রোগী জানতেই পারেন না যে তার হাড়ের ক্ষয় কতটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যখন প্রথম
হাড় ভেঙে যায়, তখনই অনেকে বুঝতে পারেন যে তারা অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত।
অস্টিওপোরোসিস রোগে
যারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে
অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে — বয়স (বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি), নারী হওয়া, পারিবারিক ইতিহাস, পাতলা শরীরের গঠন, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, অনিয়মিত জীবনযাপন, কম ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েড বা থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ সেবন ইত্যাদি। অনেক সময় কিডনি বা লিভারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, হরমোনজনিত রোগ, এবং কিছু অটোইমিউন রোগও হাড় ক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
► ৫০ বছরের বেশি বয়সী
নারী ও পুরুষ
► রজঃনিবৃত্ত (মেনোপজ)
পরবর্তী নারী
► ধূমপায়ী ও অতিরিক্ত
মদ্যপানকারী ব্যক্তি
► যারা
কম ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করে বাংলাদেশিদের মধ্যে এর হার অনেক বেশি
► শারীরিক পরিশ্রম বা
ব্যায়ামের অভাব রয়েছে যাদের আমাদের দেশে ক্রমেই শ্রমহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে
অনেকেই
► দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয়
ওষুধ ব্যবহারকারীরা
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও পুষ্টিহীনতার
কারণে এই রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে
হাড় ক্ষয়ের মাত্রা
নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো Bone Mineral Density (BMD) টেস্ট, যা
সাধারণত DEXA স্ক্যান নামেও পরিচিত। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট অংশ
যেমন কোমর, নিতম্ব বা মেরুদণ্ডের হাড়ের ঘনত্ব মাপা হয়। ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে
চিকিৎসক নির্ধারণ করেন রোগীর হাড় স্বাভাবিক, অস্টিওপেনিয়া (হাড়ের ঘনত্ব কিছুটা
কমেছে) না কি অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে
জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে এবং কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে হাড়ের ক্ষয় অনেকটাই
নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অস্টিওপোরোসিস রোগে
প্রতিরোধই সেরা উপায়
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ ও
নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক
খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। হাড়কে
মজবুত রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করা অত্যন্ত
জরুরি। দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ (বিশেষ করে শুঁটকি বা কাঁটাসহ মাছ), ডিম, বাদাম,
টোফু, তিল, পালং শাক, কলমি শাক, ব্রোকলি, এবং কলার মতো খাবারে ক্যালসিয়াম প্রচুর
থাকে। ভিটামিন ডি শরীরে তৈরি হয় সূর্যের আলো থেকে, তাই প্রতিদিন অন্তত ১৫–২০ মিনিট
রোদে থাকা উচিত। শীতকালে বা সূর্যালোকের অভাবে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি
সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
নিয়মিত
ব্যায়াম : শারীরিকভাবে
সক্রিয় থাকা অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি। নিয়মিত
ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে এবং হাড়ের গঠনকে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ
করে ওয়েট-বিয়ারিং
এক্সারসাইজ (যেমন হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ওঠা, স্কোয়াট) এবং রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ
(যেমন হালকা ভারোত্তোলন বা স্ট্রেচিং) হাড়ের জন্য উপকারী। এ ছাড়া যোগব্যায়াম বা
ব্যালান্স ট্রেনিং শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে, যা পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি
কমায়।
ধূমপান ও
অ্যালকোহল পরিহার : ধূমপান
ও অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলো শরীরে
ক্যালসিয়ামের শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে এই অভ্যাসগুলো সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা জরুরি। অতিরিক্ত
ক্যাফেইন (যেমন কফি, সফট ড্রিংক) গ্রহণও ক্যালসিয়ামের শোষণ কমিয়ে দেয়, তাই এগুলোর
পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত।
চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় : চিকিৎসার ক্ষেত্রে অস্টিওপোরোসিস সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করা
না গেলেও এর অগ্রগতি রোধ করা সম্ভব। চিকিৎসক সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দেন যা হাড়ের ক্ষয় কমিয়ে নতুন হাড় তৈরিতে সহায়তা করে। যেমন — বিসফসফোনেট (Bisphosphonates) জাতীয় ওষুধ হাড়ের ক্ষয় রোধ করে, সিলেকটিভ ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর মডুলেটর (SERMs) হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে, এবং ক্যালসিটোনিন বা টারিপারাটাইড জাতীয় ইনজেকশন হাড় পুনর্গঠনে সহায়তা করে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) অনেক সময় কার্যকর হতে পারে, তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করতে হয়।হাড়ের পরীক্ষা (BMD Test) : বয়স ৫০
বছর পার হলে বা ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সদস্য হলে বছরে অন্তত একবার Bone Mineral Density (BMD)
পরীক্ষা করা উচিত।
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে
জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন হাড় ক্ষয় শুধু বয়স্কদের
সমস্যা, কিন্তু বাস্তবে ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু
করে। তাই অল্প বয়স থেকেই সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ব্যায়াম, এবং স্বাস্থ্যকর
অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা অফিসে দীর্ঘসময় বসে কাজ করেন, তাদের প্রতিদিন অন্তত
কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা শরীরচর্চা করা উচিত।
মানসিক চাপও হাড় ক্ষয়ের
একটি গোপন কারণ হতে পারে। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল শরীরে অতিরিক্ত মাত্রায় নিঃসৃত
হলে তা হাড়ের ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে। তাই মনকে প্রশান্ত রাখার জন্য ধ্যান,
পর্যাপ্ত ঘুম, এবং ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি বজায় রাখা জরুরি।
উপসংহার
শেষ পর্যন্ত বলা যায়,
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি সমস্যা যা ধীরে ধীরে হাড়ের ভেতর থেকে ক্ষয় সৃষ্টি করে,
কিন্তু সামান্য সচেতনতা ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে একে প্রতিরোধ করা সম্পূর্ণ
সম্ভব। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, সূর্যের আলোতে থাকা,
নিয়মিত ব্যায়াম, এবং ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন করলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো
যায়। প্রবাদে যেমন বলা হয় — “প্রতিরোধই উত্তম চিকিৎসা,” অস্টিওপোরোসিসের ক্ষেত্রেও
এ কথাটি পুরোপুরি প্রযোজ্য। নিজের হাড়ের যত্ন নিন, কারণ মজবুত হাড়ই একটি সুস্থ ও
সক্রিয় জীবনের মূলভিত্তি।









0 comments:
Post a Comment