ওজন ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ একই মুদ্রার দুই পিঠ। সঠিক পুষ্টি নির্বাচন করলে ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ে, ফ্যাট জমা কমে, এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। লক্ষ্য হওয়া উচিত ধীর, স্থিতিশীল, বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক অগ্রগতি। জীবনযাপনের এই পদ্ধতিতে খাদ্য হিসেবে প্রাণিজ উৎস থেকে কোনো খাবার খাওয়া হয় না। খাওয়া হয় উদ্ভিজ্জ খাবার। শাক-সবজি, ফল, ডাল, বীজ ও বাদাম নিরামিষ খাদ্যের একটি বড় অংশ গঠন করে। তারকা, ক্রীড়াবিদসহ অনেকে এখন ভেগান ডায়েটে অভ্যস্ত। তবে ভেজিটেরিয়ান আর ভেগান কিন্তু এক নয়। ভেজিটেরিয়ানরা উদ্ভিজ্জ খাবারের পাশাপাশি দুধ, ডিম ইত্যাদি প্রাণিজ আমিষও খেয়ে থাকেন।
প্রধান খাদ্যশ্রেণী ও সুনির্দিষ্ট খাবার
১. উচ্চ আঁশ ও জটিল কার্বোহাইড্রেট
এই খাবারগুলো গ্লুকোজ ধীরে শোষণ করে, তাই হঠাৎ রক্তে সুগার
বাড়ে না এবং ওজনও কমে।
* ওটস, স্টিল কাট ওটস, বার্লি
* ব্রাউন রাইস, রেড রাইস, ফো-চাল
* হোল হুইট রুটি, রাগি/জোয়ার রুটি
* মসুর ডাল, ছোলা, রাজমা, মুগ ডাল
* লাউ, করলা, পালং, বাঁধাকপি, বরবটি, কুমড়া
কৌশল: প্লেটে কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে আঁশের পরিমাণ বাড়াতে
হবে। সাদা ভাতের বদলে ৩ দিন ব্রাউন রাইস, ৩ দিন ওটস/রুটি রোটেশন নীতি কার্যকর।
২. প্রোটিন রিচ খাবার
প্রোটিন তৃপ্তি ধরে রাখে, পেশী রক্ষায় ভূমিকা রাখে এবং
মেটাবলিজম উন্নত করে।
* ডিম (১–২টি প্রতিদিন)
* মাছ (ইলিশ, রুই, স্যামন, সার্ডিন)
* মুরগির ব্রেস্ট
* টোফু, টেম্পে, সয়াবিন
* গ্রিক ইয়োগার্ট, লো-ফ্যাট দই (চিনি ছাড়া)
কৌশল: প্রতিটি খাবারে অন্তত ২০–৩০ গ্রাম প্রোটিন রাখুন।
দিনে ৮০–১০০ গ্রাম আদর্শ (ওজন/লক্ষ্য অনুযায়ী)।
৩. স্বাস্থ্যকর চর্বি (Good Fats)
উচ্চ গুণমানের ফ্যাট ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ও
প্রদাহ কমায়।
* আখরোট, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম (পরিমিত)
* চিয়া সিড, ফ্ল্যাক্স সিড
* অলিভ অয়েল/সরিষার তেল (অতিরিক্ত নয়)
* অ্যাভোকাডো (পরিমিত)
কৌশল: ফ্রাইং বন্ধ; স্টিম/গ্রিল/সেদ্ধ/সটে বেছে নিন।
৪. ফল: কম GI, উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
* পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি
* স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি
* কমলা, মাল্টা
* পেঁপে (অল্প)
কৌশল: খালি পেটে বা জুস নয়; খাবারের সাথে বা পরে।
৫. ফারমেন্টেড খাদ্য
আন্ত্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করে, যা গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।
* দই, গ্রিক ইয়োগার্ট
* ঘরে তৈরি চাটনি/আচার (অতিরিক্ত লবণ–চিনি ছাড়া)
উপকারিতা
ওজন কমাতে
ও ব্লাড সুগার বা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
গাউট
বা ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ভেগান ডায়েট খুবই উপকারী।
ভেগান
ডায়েট প্রদাহ প্রতিরোধী। এটি শরীরে ব্যথা কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
প্রাণিজ
আমিষে চর্বি থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এতে তা নেই।
ভেগান
ডায়েট হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমায় ও হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা নিশ্চিত করে।
ভেগান ডায়েট উচ্চ ফাইবারসমৃদ্ধ, তাই
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অ্যানাল ফিসার, পাইলস, রেক্টাল ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি
কমায়।
জটিলতা
সব প্রয়োজনীয়
অ্যামাইনো অ্যাসিড ভেগান ডায়েট থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
ভেগান
ডায়েট সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হতে পারে।
প্রয়োজনীয়
যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাওয়া মুশকিল।
উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়রন জিংক
শোষণের হার কিছুটা কম থাকায়, ভেগান ডায়েটে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
ক্যালসিয়ামের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস দুধ, যা ভেগান ডায়েটে নেই।
করণীয়
শরীরের ওজন অনুযায়ী আমিষের চাহিদা মেটাতে
হয়। ভেগান ডায়েটে আমিষের উৎস হিসেবে ডাল, শিমের বিচি, মটরশুঁটিসহ সব ধরনের বাদাম, সয়াবিন,
সয়ামিট পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে।
বেশির ভাগ ডালে মেথিওনিন ও সিস্টাইন
এসেনশিয়াল অ্যামাইনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে। আবার সয়াবিন ও বাদামে মেথিওনিন এবং সিস্টাইন
এসেনশিয়াল অ্যামাইনো অ্যাসিড বেশি থাকে। যেকোনো ডালের সঙ্গে সয়াবিন বা বাদাম মিশিয়ে
রান্না করলে সব এসেনশিয়াল অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া যাবে। এই প্রোটিন ফার্স্টক্লাস প্রোটিন।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী,
ভিটামিন বি-১২, জিংক, আয়রন ও ক্যালসিয়ামের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
গুড ফ্যাট ও বিভিন্ন মাইক্রো-ম্যাক্রো
নিউট্রিয়েন্টের চাহিদা পূরণ করতে খাদ্যতালিকায় কাঠবাদাম, আখরোট, সূর্যমুখীর বীজ, কুমড়ার
বীজ, ফ্ল্যাক্স সিড যোগ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ভেগান ডায়েট চর্চা করতে চাইলে
অবশ্যই পুষ্টিবিদের নির্দেশনা মেনে চলুন। প্রতি তিন মাস পর একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের সুস্থতা নিশ্চিত করে
নিন।
এড়িয়ে চলার খাবার
শ্রেণী উদাহরণ কারণ
পরিশোধিত কার্ব
সাদা ভাত, পরোটা, পাউরুটি,
নুডলস দ্রুত
গ্লুকোজ বৃদ্ধি
মিষ্টি
রসগোল্লা,
চকলেট, আইসক্রিম উচ্চ চিনি
প্যাকেট ফুড
বেকড বিস্কুট, চিপস,
কেক ট্রান্স ফ্যাট, অ্যাডিটিভ
চিনি-যুক্ত পানীয়
কোমল পানীয়, বটলড
জুস ফ্যাট
স্টোরেজ বাড়ায়
অতিরিক্ত ফলের জুস যেকোনো ধরনের আঁশহীন অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ
Plate rule: ৫০%
সবজি, ২৫% প্রোটিন, ২৫% জটিল কার্ব
7 PM rule: রাতে
অতিরিক্ত কার্ব নয়
Water discipline: খাবারের
আগে পানি; খাবারের সাথে নয়
Slow eating: ২০
মিনিটে খাবার শেষ করুন
সর্বশেষ মন্তব্য
এই পদ্ধতি দ্রুত ফল নয়,
টেকসই রূপান্তর দেয়। শরীরকে রিসেট করতে সময় লাগে। যারা চটকদার ফলের লোভে পড়ে, তারা
শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কঠোরতা নয়; বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ।






.jpg)


.jpg)

0 comments:
Post a Comment