লিভার বা যকৃত মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত পরিশোধন, হজমে সহায়তা, গ্লুকোজ সংরক্ষণ ও দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার মতো কাজ করে। কিন্তু যখন লিভারের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখনই লিভার ক্যান্সার বা যকৃতের ক্যান্সার দেখা দেয়। এটি একটি মারাত্মক ও জটিল রোগ, যা সময়মতো সনাক্ত না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে। সারা বিশ্বে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং অনেকেই চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে জীবন হারান। তবে সচেতনতা, প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লিভার ক্যান্সার হওয়ার কারণ
শর্করা ও চর্বি গ্রহণ করলে রক্তে কোলেস্টেরল ও
গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে লিভার। অতিরিক্ত পরিমাণ শর্করাযুক্ত
খাবার; যেমন—ভাত, পোলাও বা বিরিয়ানি এবং চর্বিযুক্ত মাছ ও মাংস প্রয়োজনের চেয়ে
বেশি পরিমাণে খেলে লিভারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। এর পাশাপাশি শহুরে জীবনে
শারীরিক কর্ম কমে যাওয়ায় শরীরে প্রচুর পরিমাণে চর্বি জমতে শুরু করে। লিভারের কোষে
একসময় চর্বি প্রবেশ করে লিভারের কার্যকারিতা নষ্ট করে এবং সৃষ্টি করে প্রদাহ। এই
অবস্থাকে বলা হয় ফ্যাটি লিভার। এভাবে রোগের প্রকোপ বাড়তে বাড়তে প্রথমে দেখা দেয়
লিভার সিরোসিস এবং পরে সেটি থেকে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। লিভার ক্যান্সারের পেছনে একাধিক কারণ
কাজ করে। প্রধান কারণগুলো হলো—
1. হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস
সংক্রমণ: দীর্ঘদিন
ধরে হেপাটাইটিস বি (HBV) বা হেপাটাইটিস সি (HCV) ভাইরাস শরীরে সক্রিয় থাকলে লিভারে
প্রদাহ ও কোষ ক্ষয় হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে এই কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি
পেতে শুরু করে এবং ক্যান্সারে রূপ নেয়।
2. লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis): অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, ভাইরাস
সংক্রমণ বা চর্বি জমে যাওয়ার কারণে লিভারের কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় এবং দাগ
পড়ে। এই অবস্থাকে সিরোসিস বলে, যা লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ।
3. অতিরিক্ত মদ্যপান: দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল পান করলে
লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
4. অতিরিক্ত চর্বি ও স্থূলতা: শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে গেলে
ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হয়, যা ধীরে ধীরে সিরোসিস ও পরে লিভার ক্যান্সারে রূপ নিতে
পারে।
5. অ্যাসপারজিলাস টক্সিন (Aflatoxin):
আর্দ্র
পরিবেশে সংরক্ষিত খাদ্য যেমন বাদাম, ভুট্টা বা ধানজাত পণ্যে এক ধরনের ছত্রাক
জন্মায় যা অ্যাফ্লাটক্সিন নামক বিষ উৎপন্ন করে। এটি লিভারের কোষে জিনগত পরিবর্তন
ঘটিয়ে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
6. ডায়াবেটিস: দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণ হয়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
7. বংশগত কারণ: পরিবারের কারও লিভার ক্যান্সার
থাকলে অন্য সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি থাকে।
8. অন্যান্য কারণ: ধূমপান, দূষিত খাবার, রাসায়নিক
পদার্থের সংস্পর্শ, কিছু ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহও লিভার
ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
লিভার ক্যান্সারের উপসর্গ
লিভার ক্যান্সারের
প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেক সময় রোগী
দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। তবে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি —
· অবিরাম ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা
·
পেটে বা ডান পাশে ব্যথা বা ভার
অনুভব করা
·
পেট ফোলা বা অস্বস্তি
·
খাবারে অনীহা ও দ্রুত ওজন কমে
যাওয়া
·
বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
·
ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে
যাওয়া (জন্ডিস)
·
চুলকানি ও গা কালচে হয়ে যাওয়া
·
প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া এবং মল
হালকা রঙের হওয়া
·
জ্বর বা শরীরে ব্যথা
এই উপসর্গগুলো অনেক সময়
অন্যান্য লিভারজনিত রোগেও দেখা যেতে পারে। তাই সঠিক কারণ জানতে রক্ত পরীক্ষা,
আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করানো প্রয়োজন।
লিভার ক্যান্সারের ধরণ
লিভার ক্যান্সার প্রধানত
দুই ধরনের হতে পারে —
1. প্রাইমারি লিভার ক্যান্সার
(Primary Liver Cancer): এটি
তখন হয়, যখন ক্যান্সার সরাসরি লিভারের কোষ থেকেই উৎপন্ন হয়। সবচেয়ে সাধারণ প্রকার
হলো হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (Hepatocellular
Carcinoma)।
2. সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক লিভার
ক্যান্সার: এটি
অন্য অঙ্গের ক্যান্সার (যেমন ফুসফুস, স্তন বা বৃহদান্ত্র) থেকে ছড়িয়ে লিভারে আসে।
এই ধরনের ক্যান্সার সাধারণত বেশি জটিল এবং চিকিৎসা কঠিন।
দেশে-বিদেশে লিভার ক্যান্সারের চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ক্যান্সারে
মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ লিভার ক্যান্সার। আমাদের দেশে এর সঠিক পরিসংখ্যান না
থাকলেও লিভার সার্জারি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমরা দেখি, প্রতিদিন অসংখ্য রোগী লিভার
ক্যান্সার নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। উদ্বেগজনক বিষয়, এই রোগীরা রোগের
একেবারে শেষ এবং জটিল পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।
তখন চিকিৎসার তেমন উপায় থাকে না। ফলে
তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই
তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসকের পক্ষে সেটি ঠেকানো সম্ভব হয় না।
লিভার ক্যান্সারের নির্ণয়
লিভার ক্যান্সার সনাক্ত
করতে নিচের পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে —
·
রক্ত
পরীক্ষা:
আলফা-ফিটোপ্রোটিন (AFP) নামক একটি প্রোটিনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে লিভার
ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে।
·
আল্ট্রাসনোগ্রাফি
বা সিটি স্ক্যান:
লিভারে টিউমার বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আছে কিনা তা শনাক্ত করা যায়।
·
বায়োপসি
(Biopsy):
সন্দেহজনক টিস্যুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয় এটি ক্যান্সার কিনা।
লিভার ক্যান্সারের প্রতিকার ও চিকিৎসা
লিভার ক্যান্সারের
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরণ, পর্যায়, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থার উপর। চিকিৎসা
সাধারণত নিম্নলিখিত উপায়ে করা হয় —
1. অস্ত্রোপচার (Surgery): প্রাথমিক পর্যায়ে যদি টিউমার ছোট
হয় এবং লিভারের অন্য অংশ সুস্থ থাকে, তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা
যায়।
2. লিভার ট্রান্সপ্লান্ট (Liver
Transplant): উন্নত
পর্যায়ে যদি লিভার পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লান্ট)
করা হতে পারে। এটি জটিল ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া।
3. রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি: ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস বা বৃদ্ধি
রোধ করতে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। বর্তমানে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি নামক
আধুনিক পদ্ধতিও ব্যবহার হচ্ছে।
4. লোকাল এবলেশন থেরাপি: এটি একটি আধুনিক পদ্ধতি যেখানে
সরাসরি টিউমারে তাপ, রেডিও ওয়েভ বা অ্যালকোহল প্রয়োগ করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা
হয়।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মানা যায় —
1. হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নেওয়া: এটি লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধের
সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
2. হেপাটাইটিস সি প্রতিরোধে সচেতনতা: সংক্রমিত রক্ত, সূচ বা ব্লেড
ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত।
3. অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার করা: এগুলো লিভারের ক্ষতি করে
ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
4. সুষম খাদ্যাভ্যাস: তাজা ও পরিশুদ্ধ খাবার খাওয়া,
সংরক্ষিত ও ছত্রাকযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
5. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম: স্থূলতা ও ফ্যাটি লিভার রোধে
নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা প্রয়োজন।
6. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: বিশেষ করে যারা হেপাটাইটিসে
আক্রান্ত বা দীর্ঘদিন মদ্যপান করেন, তাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা
উচিত।
7. জন্মের সময় মা যদি
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে বাচ্চাকে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের
প্রয়োজনীয় টিকা নিতে হবে।
8. সেলুনে কাঁচি-ব্লেড
শুধু একজনের জন্য ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
9. প্রয়োজনীয়
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষা করে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের ব্যবস্থা করা।
10. প্রতি বেলায় কম ভাত,
সবজি বেশি খাওয়া। পোলাও বা বিরিয়ানি যতটা সম্ভব কম খাওয়া। প্রতিদিন এক ঘণ্টা
হাঁটা, ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণ করা।
উপসংহার
লিভার ক্যান্সার একটি
নীরব ঘাতক রোগ, যা প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝা কঠিন। তবে সময়মতো শনাক্ত করা গেলে অনেক
ক্ষেত্রেই চিকিৎসা সম্ভব এবং রোগীর আয়ু বাড়ানো যায়। সুস্থ লিভার মানে সুস্থ জীবন,
তাই আমাদের উচিত শরীর ও খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া, মদ্যপান ও ধূমপান পরিহার করা,
হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নেওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো। মনে রাখবেন,
প্রতিরোধই এই রোগের সর্বোত্তম প্রতিকার। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।











0 comments:
Post a Comment