Tuesday, November 11, 2025

ছোট বাচ্চাদের কানপাকা রোগ (Otitis Media): কারণ, উপসর্গ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

 


কানপাকা রোগ শিশুদের মধ্যে একটি খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বসহকারে নজর দেওয়া উচিত এমন সমস্যা। অনেক সময় এটি সর্দি-কাশি, ঠান্ডা বা সংক্রমণের কারণে হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর শ্রবণ শক্তি বা কানের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

শিশুদের মধ্যে কানপাকা রোগ দেখা যায় অহরহ। দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ শিশু কানপাকার উপসর্গে ভুগছে। অনেকের মনেই ভ্রান্ত ধারণা, শিশুর কানে পানি ঢুকে কান পেকে গেছে। রোগটির সঠিক কারণ জানা না থাকায় অনেকেই সঠিক প্রতিরোধ বা চিকিৎসা নিতে পারে না, শিশুর কানে বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

কানপাকা রোগ কীভাবে হয়?

শিশুর কান তিন ভাগে বিভক্ত  : আমাদের কান তিন ভাগে বিভক্তবহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ অন্তঃকর্ণ। বহিঃকর্ণ মধ্যকর্ণের মাঝখানে আমাদের কানের পর্দা থাকে এবং জন্মগতভাবে এটিতে কোনো ছিদ্র থাকে না। সুতরাং চাইলেই কানের অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ করতে পারে না। নাকের সঙ্গে কান ইউস্টেশিয়ান টিউবের মাধ্যমে সংযুক্ত।

1.           বাহ্যিক কান (Outer Ear)

2.      মধ্যকর্ণ (Middle Ear)

3.        অন্তঃকর্ণ (Inner Ear)

যখন নাক বা গলার সংক্রমণ মধ্যকর্ণে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে তরল জমে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায় এই অবস্থাকেই আমরা সাধারণভাবে "কানপাকা" বলি।

ছোট বাচ্চাদের মধ্যে কেন বেশি হয়?

ছোট বাচ্চাদের মধ্যে কানপাকা রোগ বেশি দেখা যায় কিছু নির্দিষ্ট কারণে

1.                   ইউস্টেশিয়ান টিউব ছোট সরু: এতে সহজে ব্লক হয়ে সংক্রমণ হয়।

2.                  ঘন ঘন সর্দি-কাশি: শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

3.                 দুধ খাওয়ানোর ভঙ্গি ভুল: শুয়ে দুধ খাওয়ালে দুধ কানে চলে যেতে পারে।

4.                  অ্যালার্জি বা সাইনাস সমস্যা: এসব সমস্যা কানের ভেতরের পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

5.                 ধূমপানের ধোঁয়া: পরিবারের কেউ ধূমপান করলে শিশুর কান সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

কানপাকার সাধারণ উপসর্গ

·         কান ব্যথা (বিশেষ করে রাতে বেশি হয়)

·         কান দিয়ে পানি, তরল বা পুঁজ বের হওয়া

·         জ্বর ঘুমে অস্থিরতা

·         শিশুর কান টেনে ধরা বা কান্না করা

·         খাওয়ার সময় কান ব্যথা বৃদ্ধি

·         সাময়িক শ্রবণ সমস্যা

·         বিরক্তি, খাওয়ায় অনীহা

কানপাকা রোগের ধরণ

1.                   Acute Otitis Media (হঠাৎ শুরু হওয়া সংক্রমণ): জ্বর ব্যথা বেশি থাকে।

2.                  Otitis Media with Effusion (তরল জমা থাকা): পুঁজ না বের হলেও কানে ভারী অনুভূতি বা শুনতে অসুবিধা হয়।

3.                 Chronic Suppurative Otitis Media (দীর্ঘস্থায়ী কানপাকা): দীর্ঘ সময় ধরে কান দিয়ে পুঁজ পড়া অবস্থা।

চিকিৎসা প্রতিকার

1.                   ডাক্তারি পরামর্শ: নিজে থেকে কান পরিষ্কার বা ওষুধ ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা ENT ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

2.                   অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের জন্য ডাক্তার নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দেন।

3.                 কান শুকনো রাখা: গোসল বা সাঁতারের সময় কানে পানি ঢোকা বন্ধ করতে হবে।

4.                  ব্যথানাশক জ্বরের ওষুধ: যেমনপ্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন (ডাক্তারি পরামর্শে)

5.                 গরম সেঁক: কানের আশেপাশে হালকা গরম সেঁক দিলে আরাম মেলে।

6.                  লম্বা সময় পুঁজ পড়লে টেস্ট: ডাক্তার Tympanometry বা Hearing Test করতে পারেন।

প্রতিরোধের উপায়

চিত করে শুইয়ে দুধ পান করানো বিপজ্জনক। তরল নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। সুতরাং চিত অবস্থায় মুখ থেকে দুধ সরাসরি ইউস্টেশিয়ান টিউবের মাধ্যমে মধ্যকর্ণে জমা হতে পারে। শিশুকে না শুইয়ে বসিয়ে বা কোলে আড়াআড়িভাবে রেখে দুধ পান করালেই কানপাকা রোগের আশঙ্কা কমে যাবে।

1.                   শিশুকে ঠান্ডা বা ধুলা থেকে দূরে রাখুন।

2.                  শিশুকে আধা-বসে অবস্থায় দুধ খাওয়ান।

3.                 সময়মতো টিকা দিনযেমন Pneumococcal Influenza টিকা।

4.                  পরিবারের মধ্যে ধূমপান বন্ধ করুন।

5.                 শিশুর কান পরিষ্কার রাখতে নরম কাপড় বা তুলা ব্যবহার করুন, কিন্তু কানের ভেতরে কাঠি দেবেন না।

6.                 ঘন ঘন সর্দি-কাশির সময় কানের যত্ন বাড়ান।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

·         কান দিয়ে নিয়মিত পানি বা পুঁজ পড়ছে

·         জ্বর কমছে না

·         শিশু ঠিকমতো শুনতে পারছে না

·         শিশুর ঘুম খাওয়ার সমস্যা হচ্ছে

·         বারবার একই সমস্যা হচ্ছে

উপসংহার

ছোট বাচ্চাদের কানপাকা রোগ সাধারণত সহজে সেরে যায়, তবে অবহেলা করলে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা স্থায়ী শ্রবণ সমস্যা হতে পারে। তাই যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



0 comments:

Post a Comment