Wednesday, November 12, 2025

স্তন ক্যান্সার (Breast Cancer): কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ


বিশ্ব
স্তন ক্যান্সার সচেনতা মাস অক্টোবর। প্রতি বছর ২৩ লাখ নারী আক্রান্ত হয় এই রোগে, মারা যায় ছয় লাখেরও বেশি রোগী। সচেতন থাকলে এই রোগ অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য।

স্তন ক্যান্সার হলো এমন এক ধরনের ক্যান্সার যেখানে স্তনের কোষ (বিশেষ করে ডাক্ত বা লোবিউল কোষ) অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি মূলত মহিলাদের মধ্যে দেখা গেলেও পুরুষেরাও আক্রান্ত হতে পারেন। নারীরা যে ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন, সেটি স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার। বিশ্বে প্রতি আটজন নারীর মধ্যে একজন জীবনের কোনো এক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে সেটি শনাক্ত করা যায়, তাহলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণভাবে নিরাময় সম্ভব।

প্রাথমিকভাবে এই কোষ বৃদ্ধি স্তনে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু চিকিৎসা না করলে তা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ যেমন হাড়, লিভার বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে (মেটাস্টেসিস)। সচেতন হলে, নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।

স্তন ক্যান্সারের প্রধান কারণ ও ঝুঁকির ফ্যাক্টর

স্তন ক্যান্সারের নির্দিষ্ট একক কারণ নেই, তবে কিছু কারণ ঝুঁকি বাড়ায় —

১. জেনেটিক বা বংশগত কারণ

·         পরিবারের কারও (মা, বোন, ফুফু) স্তন ক্যান্সার থাকলে

·         BRCA1 ও BRCA2 নামের জিনে পরিবর্তন থাকলে

২. হরমোনজনিত কারণ

·         দেরিতে মাসিক শুরু (১২ বছরের পর) বা দেরিতে মেনোপজ হওয়া (৫০ বছরের পর)

·         দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে থাকা

·         জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা হরমোন থেরাপি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা

·         হরমোনজাত ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার।

·         কম বয়সে মাসিক শুরু এবং মেনোপজ দেরিতে হলে।

৩. জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস

·         চর্বিযুক্ত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বেশি খাওয়া

·         ব্যায়ামের অভাব ও স্থূলতা

·         ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ

·         স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন।

৪. সন্তান ও স্তন্যদান সংক্রান্ত কারণ

·         সন্তান না হওয়া বা দেরিতে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়া

·         সন্তানকে স্তন্যদান না করা

·         স্তন ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব সময় জানা যায় না। তবে কিছু ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

·         সন্তান না হলে, বা অধিক বয়সে গর্ভধারণ করলে।

স্তন ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ

প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার সাধারণত ব্যথাহীন চাকা হিসেবে অনুভূত হয়। স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ব্যথা নাও হতে পারে, কিন্তু কিছু লক্ষণ সতর্ক সংকেত হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

·         স্তনে বা বগলের নিচে শক্ত গাঁট বা ফোলা

·         স্তনের আকার বা ত্বকের পরিবর্তন (কুঁচকে যাওয়া, রঙ পরিবর্তন)

·         স্তনবৃন্ত ভেতরে ঢুকে যাওয়া বা জায়গা পরিবর্তন

·         স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা দুধের মতো তরল নির্গমন

·         স্তনে বা বগলে ব্যথা বা ভারী লাগা

·         ত্বকে ঘা বা ক্ষত যা সারছে না

স্তন ক্যান্সারের ধরণ

স্তন ক্যান্সারের কয়েকটি ধরণ রয়েছে, যেমন:

1.    ডাক্টাল কার্সিনোমা ইন সিটু (DCIS) – স্তনের ডাক্টে সীমাবদ্ধ ক্যান্সার

2.    ইনভেসিভ ডাক্টাল কার্সিনোমা (IDC) – স্তনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার

3.    লোবুলার কার্সিনোমা – দুধ উৎপাদনকারী অংশে (লোবিউল) ক্যান্সার

4.    ইনফ্লেমেটরি স্তন ক্যান্সার – স্তনের ত্বক লালচে ও ফুলে যাওয়া

5.    ট্রিপল নেগেটিভ স্তন ক্যান্সার – চিকিৎসা জটিল এক ধরণ, যেখানে তিনটি নির্দিষ্ট রিসেপ্টর অনুপস্থিত থাকে

স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ের পদ্ধতি

প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ চিকিৎসার সাফল্য বাড়ায়। সাধারণ পরীক্ষাগুলি হলো:

·         Breast Self-Examination (নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা)

·         Clinical Breast Examination (চিকিৎসকের পরীক্ষা) : প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা সার্জন এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই ক্যান্সারের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন। ২০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতিবছর এই পরীক্ষা করানো উচিত।

·         Mammogram (স্তনের এক্স-রে) : এটি স্তনের গভীরে থাকা অতি ক্ষুদ্র টিউমারও শনাক্ত করতে পারে। বয়স ৪০ পেরোলেই প্রতি ১২ বছর অন্তর প্রত্যেক নারীর ম্যামোগ্রাম করা উচিত। পরিবারের কারো স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকলে ৩০ বছর বয়স থেকেই চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে।

·         Ultrasound / MRI Scan : যুবতী নারীদের স্তন টিস্যু সাধারণত ঘন (dense) হয়, তাই ম্যামোগ্রামে সব সময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যও এটি নিরাপদ।

·         Biopsy (টিস্যু পরীক্ষা)

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা

চিকিৎসা রোগীর অবস্থা, ক্যান্সারের ধরণ, বয়স, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ও পর্যায়ের উপর নির্ভর করে। সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:

1.    সার্জারি (অপারেশন): ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ বা পুরো স্তন অপসারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার হলে শুধু ক্যান্সারযুক্ত অংশটি কেটে ফেলে দেওয়া হয়, স্তন অক্ষত থাকে, এর নাম লাম্পেকটমি। তবে কিছু রোগীর মাস্টেকটমি বা সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ প্রয়োজন হতে পারে।

2.    কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।

3.    রেডিওথেরাপি: বিকিরণ প্রয়োগ করে কোষ ধ্বংস করা।

4.    হরমোন থেরাপি: হরমোন রিসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ করে ক্যান্সারের বৃদ্ধি রোধ করা।

5.    টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি: নতুন ও কার্যকরী আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, পর্যায়, ওপর। চিকিৎসার প্রধান ধাপগুলো হলো

স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায়

·         প্রতি মাসে নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা (Breast Self-Exam)

·         বছরে একবার চিকিৎসকের কাছে চেকআপ করা

·         ৪০ বছরের পর নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করা

·         স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম

·         ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা

·         সন্তানকে স্তন্যদান করা

·         অপ্রয়োজনীয় হরমোন ওষুধ না খাওয়া

উপসংহার

স্তন ক্যান্সার একটি গুরুতর রোগ হলেও এটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।



0 comments:

Post a Comment