ডায়াবেটিস বা মধুমেহ একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকজনিত রোগ যা শরীরে রক্তের গ্লুকোজ (চিনি) মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। ইনসুলিন নামক একটি হরমোন, যা অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) থেকে নিঃসৃত হয়, শরীরে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না, অথবা শরীর ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে গ্লুকোজ জমে যায় এবং তখনই ডায়াবেটিস দেখা দেয়। আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এই রোগের প্রসারকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ
মানবদেহের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে শর্করা ও চিনি
(গ্লুকোজ)। কিন্তু দেহের কোষগুলো সরাসরি শর্করা ব্যবহার করতে পারে না।
তাই পরিপাকতন্ত্রের কাজ খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি করা। শরীরে যাতে
গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত না হয়ে যায় সে জন্য অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের একটি
হরমোন নিঃসৃত হয়।
দেহের কোষগুলোকে চিনি
গ্রহণ করার নির্দেশনা দেয় সেটি। এভাবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা থাকে নিয়ন্ত্রণে।
যদি কোনো কারণে দেহে ঠিকমতো ইনসুলিন তৈরি না হয়, অথবা সেটি ঠিকমতো কাজ না করে তখন
দেখা দেয় ডায়াবেটিস। এর ফলে রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে শুরু করে, যার
প্রভাবে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে দেখা দেয় নানাবিধ জটিলতা। ডায়াবেটিসের
পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। প্রধান কারণগুলো হলো —
1. বংশগত কারণ: যদি পরিবারের কারো ডায়াবেটিস
থাকে, বিশেষ করে বাবা-মা বা ভাইবোনের, তাহলে অন্য সদস্যের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি
বেড়ে যায়।
2. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা: অতিরিক্ত চর্বি শরীরে ইনসুলিনের
কার্যক্ষমতা হ্রাস করে, যার ফলে রক্তে চিনি বেড়ে যায়।
3. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবে শরীর
ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
4. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: বেশি পরিমাণে চিনি, পরিশোধিত
কার্বোহাইড্রেট ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
5. মানসিক চাপ: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হরমোনের
ভারসাম্য নষ্ট করে, যা ইনসুলিনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
6. বয়স: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের
ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমে যায়, ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
7. হরমোনজনিত ওষুধ ও অন্যান্য কারণ: কিছু ওষুধ যেমন স্টেরয়েড জাতীয়
ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে বা কিছু হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিসের ধরণ
টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের লক্ষণ শৈশব থেকেই দেখা দিতে
পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সেটি হয়ে ওঠে আরো জটিল। অন্যদিকে বয়স ৪০ বছর পার হওয়ার পর
থেকে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনের মধ্যে এই
ঝুঁকি তৈরি হয় তাদের ২৫ বছর বয়স হওয়ার পর থেকেই। যাদের মা-বাবা, ভাই-বোনের
ডায়াবেটিস আছে, অথবা যাদের দেহে অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, তাদের মধ্যে টাইপ টু
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়, আফ্রো-ক্যারিবিয়ান অথবা কৃষ্ণাঙ্গ
আফ্রিকানদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে। ডায়াবেটিস সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত —
1. টাইপ–১ ডায়াবেটিস:
এটি সাধারণত শিশু বা তরুণ বয়সে দেখা যায়। এখানে অগ্ন্যাশয় একেবারেই ইনসুলিন তৈরি
করতে পারে না। এই ধরণের রোগীদের আজীবন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। এটি একটি অটোইমিউন
রোগ, অর্থাৎ শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরিকারক
কোষগুলোকে নষ্ট করে ফেলে।
2. টাইপ–২ ডায়াবেটিস:
এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরণ এবং সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে দেখা যায়। এই অবস্থায় শরীর
ইনসুলিন তৈরি করে, কিন্তু ইনসুলিন শরীরে ঠিকমতো কাজ করে না (ইনসুলিন
রেজিস্ট্যান্স)। ধীরে ধীরে ইনসুলিনের পরিমাণও কমে যেতে পারে। টাইপ–২ ডায়াবেটিস
মূলত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা ও বংশগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
3. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational
Diabetes):
গর্ভাবস্থায় কিছু নারীর শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গিয়ে সাময়িকভাবে রক্তে
চিনি বেড়ে যায়। সাধারণত সন্তান জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে
তাদের টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
ডায়াবেটিসের উপসর্গ
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক
পর্যায়ে অনেক সময় কোনো উপসর্গ স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। তবে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো
লক্ষ্য করলে সচেতন হওয়া জরুরি —
· বারবার প্রস্রাব হওয়া
·
অতিরিক্ত
তৃষ্ণা লাগা
·
বারবার
ক্ষুধা পাওয়া
·
অজান্তে
ওজন কমে যাওয়া
·
সহজে
ক্লান্তি অনুভব করা
·
ক্ষত
বা ঘা ধীরে ধীরে শুকানো
·
দৃষ্টিশক্তি
ঝাপসা হয়ে যাওয়া
·
হাত-পা
অবশ বা ঝিনঝিন করা
·
ঘন
ঘন সংক্রমণ (ত্বক, মাড়ি বা মূত্রনালি সংক্রমণ)
যদি এ ধরনের উপসর্গ দেখা
দেয়, তবে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস আছে কিনা তা নিশ্চিত করা উচিত।
ডায়াবেটিসের জটিলতা
রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালির
মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তখন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বাধাপ্রাপ্ত
হয়। রক্তের প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডায়াবেটিস থেকে হতে পারে গ্লকোমা। এর প্রভাবে দৃষ্টিশক্তি হারাতে হতে পারে।
অতিরিক্ত গ্লুকোজ থেকে বারবার হতে পারে ইনফেকশন। এ ছাড়া রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ
কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ
ডায়াবেটিস। তাই সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকা অত্যন্ত
জরুরি। ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন
নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের প্রায় সব অঙ্গেই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যেমন —
·
হৃদরোগ
ও স্ট্রোক:
উচ্চ রক্তচিনি ধমনীর প্রাচীর শক্ত করে, ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
·
কিডনি
বিকল:
দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে কিডনির ফিল্টারিং ব্যবস্থা নষ্ট হতে পারে।
·
চোখের
ক্ষতি (রেটিনোপ্যাথি):
চোখের রেটিনায় ক্ষুদ্র রক্তনালিতে ক্ষতি হয়, যা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
·
পায়ের
ক্ষত ও গ্যাংগ্রিন:
পায়ে স্নায়ু ক্ষতি ও রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে পায়ের ঘা শুকায় না, কখনও কেটে
ফেলতে হয়।
·
স্নায়ুজনিত
সমস্যা:
হাত-পা অবশ, জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনুভূত হয়।
ডায়াবেটিসের প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণ
ডায়াবেটিস পুরোপুরি
নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক নিয়ম মেনে চললে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নিচে কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো —
1. সুষম খাদ্যাভ্যাস:
o
চিনি,
মিষ্টি ও অতিরিক্ত তেল-চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা।
o
প্রতিদিন
প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া।
o
ভাত
বা রুটি পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া।
o
ছোট
পরিমাণে কিন্তু বারবার খাবার খাওয়া ভালো।
2. নিয়মিত ব্যায়াম:
প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা বা হালকা শারীরিক পরিশ্রম রক্তের চিনি
নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
3. ওজন নিয়ন্ত্রণ:
স্থূলতা কমানো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
4. ঔষধ ও ইনসুলিন:
টাইপ–২ ডায়াবেটিস রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মুখে খাওয়ার ওষুধ নিতে পারেন।
টাইপ–১ রোগীদের ইনসুলিন ইনজেকশন অপরিহার্য। কখনও কখনও টাইপ–২ রোগীদেরও ইনসুলিন
নিতে হয়।
5. নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা:
নিয়মিতভাবে রক্তে গ্লুকোজ, কোলেস্টেরল ও কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা উচিত।
6. ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার:
এগুলো ডায়াবেটিসের জটিলতা বাড়ায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
7. মানসিক চাপ কমানো:
ধ্যান, যোগব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক প্রশান্তি এনে রক্তচাপ ও রক্তচিনি
নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
উপসংহার
বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিস
একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে সুখবর হলো—সচেতনতা,
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত চিকিৎসা অনুসরণ করলে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা
যায় এবং জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সুস্থ থাকতে হলে খাদ্যাভ্যাসে সংযম,
নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মনে রাখবেন,
ডায়াবেটিস কোনো অভিশাপ নয়; এটি একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য জীবনযাপনজনিত অবস্থা। নিজের
যত্ন নিন, নিয়ম মেনে চলুন, তাহলেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।











0 comments:
Post a Comment