Friday, November 21, 2025

ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার রোগ: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

 


ডিমেনশিয়া এমন একটি স্নায়বিক রোগ যার ফলে ধীরে ধীরে মানুষের স্মরণশক্তি, চিন্তাভাবনা, বিচারবিশ্লেষণ ক্ষমতা, ভাষা ব্যবহার, আচরণ ও দৈনন্দিন কাজ করার দক্ষতা হ্রাস পেতে থাকে। এটি কোনো একক রোগ নয়; বরং মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত বিভিন্ন অবস্থার সম্মিলিত রূপ। সাধারণভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিছু ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক; তবে যখন ভুলে যাওয়ার পরিমাণ এত বেশি হয়ে যায় যে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তখনই তাকে ডিমেনশিয়া বলা হয়। বিশ্বজুড়ে বয়সজনিত এই রোগটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবার ও সমাজে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। তাই ডিমেনশিয়ার কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। অমনোযোগিতা বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ডিমেনশিয়া আর বয়সের প্রভাব এক নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বিভিন্ন কারণে অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার লক্ষণ। ডিমেনশিয়া দেখা দিলে শুধু স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায় না, বরং এর পাশাপাশি দেখা দেয় ভাষাগত ও আচরণগত সমস্যা, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, বুদ্ধিমত্তার লোপ, মনোবৈকল্য ইত্যাদি।

বাড়ছে ডিমেনশিয়া রোগী

জীবনযাত্রার পদ্ধতি এবং মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির সঙ্গে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা পাঁচ কোটি, ২০৩০ সালে সংখ্যাটি বেড়ে সাত কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আমাদের দেশে ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, অনুমিত ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা ছিল চার লাখ ৬০ হাজার।

আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে আট লাখ ৩৪ হাজারে। এই বিপুল পরিমান রোগীদের মানস্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন জনসচেততা বৃদ্ধি করা।

 

ডিমেনশিয়া কেন হয়: প্রধান কারণগুলো

ডিমেনশিয়া সাধারণত মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হয়। যেসব কারণে এ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. আলঝেইমার রোগ (Alzheimer’s Disease)

ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো আলঝেইমার রোগ। এই রোগে মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক প্রোটিন জমে নিউরন বা স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের স্মৃতিনিয়ন্ত্রণ অংশ প্রথমে আক্রান্ত হয়, ফলে রোগীর স্মৃতিশক্তি দ্রুত হ্রাস পায়।

২. ভ্যাসকুলার ডিমেনশিয়া

মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে গেলে বা ছোট ছোট স্ট্রোক হলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ভ্যাসকুলার ডিমেনশিয়া দেখা দেয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও উচ্চ কোলেস্টেরল এর ঝুঁকি বাড়ায়।

৩. লুই বডি ডিমেনশিয়া (Lewy Body Dementia)

মস্তিষ্কের কোষে লুই বডি নামক অস্বাভাবিক প্রোটিন জমে এই রোগ হয়। এতে স্মৃতিশক্তির সাথে সাথে নড়াচড়া, ভারসাম্য ও আচরণেও পরিবর্তন আসে।

৪. ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া (FTD)

মস্তিষ্কের সামনের ও পাশের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও ভাষাগত সমস্যাসহ FTD দেখা দেয়। এটি তুলনামূলক কম বয়সে, অর্থাৎ ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সেও হতে পারে।

৫. অন্যান্য কারণ

·         মাথায় আঘাত

·         অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ

·         থাইরয়েড রোগ

·         ভিটামিন বি–১২ ঘাটতি

·         ব্রেইন টিউমার

·         পারকিনসন রোগ

·         সংক্রমণ (যেমন HIV, সিফিলিস)

কখনো কখনো এসব কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিলে ডিমেনশিয়ার লক্ষণ উন্নতি করানো সম্ভব।

ডিমেনশিয়ার লক্ষণ: যেগুলো লক্ষ্য করলে সতর্ক হওয়া জরুরি

ডিমেনশিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং সময়ের সাথে গুরুতর হয়। সাধারণত নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায়—

১. স্মৃতিশক্তি হ্রাস

·         সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা ভুলে যাওয়া

·         একই প্রশ্ন বারবার করা

·         গুরুত্বপূর্ণ তারিখ বা সময় মনে রাখতে না পারা

২. চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া

·         হিসাব-নিকাশে সমস্যা

·         দৈনন্দিন পরিকল্পনা করতে অক্ষমতা

·         সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা

৩. ভাষাগত সমস্যা

·         কথা বলতে বা সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা

·         কথার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা

৪. আচরণ ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন

·         হঠাৎ রাগ, বিরক্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ

·         সামাজিকতা কমে যাওয়া

·         আগ্রহ ও আনন্দের অভাব

৫. দৈনন্দিন কাজে অক্ষমতা

·         রান্না, গোসল, পোশাক পরা বা টাকা-পয়সা সামলাতে সমস্যা

·         পরিচিত রাস্তা ভুলে যাওয়া

৬. মানসিক বিভ্রান্তি ও দিকনির্ণয় সমস্যা

·         সময়, স্থান বা ব্যক্তি চিনতে অসুবিধা

·         ঘুরে বেড়ানো বা পথ হারিয়ে ফেলা

৭. শারীরিক পরিবর্তন

বিশেষ কিছু ডিমেনশিয়ায় হাঁটা-চলা, ভারসাম্য ও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যদি এসব লক্ষণ নিয়মিত দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ডিমেনশিয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

ডিমেনশিয়া নির্ণয়ে চিকিৎসক সাধারণত—

·         স্মৃতি ও মানসিক ক্ষমতার পরীক্ষা (MMSE, MoCA)

·         রক্ত পরীক্ষা (থাইরয়েড, ভিটামিন B12 ইত্যাদি)

·         মস্তিষ্কের স্ক্যান—MRI বা CT scan

·         স্নায়ুবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার কারণ ও ধাপ নির্ণয় করা হয়।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা: যা করা যেতে পারে

ডিমেনশিয়ার সম্পূর্ণ ও স্থায়ী চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা, থেরাপি ও যত্নের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করা সম্ভব।

১. ওষুধ

ডিমেনশিয়ার ধরনের ওপর নির্ভর করে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, যেমন—

·         কোলিনেস্টেরেজ ইনহিবিটার (Donepezil, Rivastigmine)

·         NMDA receptor antagonist (Memantine)

এগুলো স্মৃতি, আচরণ ও চিন্তাশক্তি কিছুটা উন্নত করে।

২. থেরাপি

·         কগনিটিভ স্টিমুলেশন থেরাপি – মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখে

·         বিহেভিয়ারাল থেরাপি – আচরণগত সমস্যা কমায়

·         অকুপেশনাল থেরাপি – দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ায়

৩. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি

·         পর্যাপ্ত ফল, সবজি, বাদাম ও মাছ

·         ভিটামিন B১২ ও D নিশ্চিত করা

·         কম লবণ, কম চর্বি

৪. শারীরিক ব্যায়াম

নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।

৫. মানসিক ব্যায়াম

·         ধাঁধা, পাজল, পড়া বা নতুন কিছু শেখা

·         সামাজিকতা বজায় রাখা

৬. পরিবার ও পরিচর্যা

রোগীকে নিরাপদ, শান্ত ও পরিচিত পরিবেশে রাখা জরুরি। পরিবারকে রোগীর আচরণ বুঝতে হবে এবং ধৈর্য ধরে সাহায্য করতে হবে।

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে করণীয়

যদিও সব ধরনের ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা যায় না, তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে—

·         নিয়মিত ব্যায়াম

·         সুষম খাদ্য

·         ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা

·         উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

·         মস্তিষ্কের ব্যায়াম

·         পর্যাপ্ত ঘুম

·         সামাজিক সম্পৃক্ততা

·         ওজন নিয়ন্ত্রণ

উপসংহার

ডিমেনশিয়া এমন এক দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা যা শুধু রোগীকেই নয়, পরিবারকেও মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রভাবিত করে। তাই ভুলে যাওয়ার লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করলে চিকিৎসা, থেরাপি ও পরিচর্যার মাধ্যমে রোগীর জীবনমান অনেকটাই উন্নত করা সম্ভব। বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক ব্যায়াম, নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। নিজের ও পরিবারের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এখন থেকেই সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।



0 comments:

Post a Comment