হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির রোগ (করোনারি আর্টারি ডিজিজ) কী?
হৃৎপিণ্ডের রক্তনালি (করোনারি ধমনি) হৃদযন্ত্রে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে। এই নালিতে চর্বি,
কোলেস্টেরল বা ক্যালসিয়াম জমে
সংকীর্ণ বা অবরুদ্ধ হলে
রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। একে করোনারি
আর্টারি
ডিজিজ
(Coronary Artery Disease - CAD) বলা
হয়। এটি হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরের
প্রধান কারণগুলোর একটি।
হৃৎপিণ্ড মানুষের
শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত সঞ্চালনের
মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ
করে। এই হৃদপিণ্ডে রক্ত
সরবরাহ করে করোনারি ধমনিসমূহ। যখন এই রক্তনালিগুলোর ভেতর
চর্বি, কোলেস্টেরল বা অন্যান্য পদার্থ
জমে সংকীর্ণ বা বন্ধ হয়ে
যায়, তখন রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকে করোনারি আর্টারি
ডিজিজ
(Coronary Artery Disease - CAD) বলা
হয়, যা বিশ্বজুড়ে হৃদরোগের
অন্যতম প্রধান কারণ।
হৃদপিণ্ডের রক্তনালির রোগের মধ্যে প্রধান হলো করোনারি আর্টারি ডিজিজ, অ্যাঞ্জাইনা, হার্ট অ্যাটাক, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস এবং হার্ট ফেইলিউর। করোনারি আর্টারি ডিজিজে রক্তনালির দেয়ালে চর্বি জমে প্লাক তৈরি হয়, যা ধমনিকে সংকুচিত
করে। অ্যাঞ্জাইনায় বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত
হয় কারণ হৃদয়ে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না। হার্ট অ্যাটাক ঘটে যখন কোনো রক্তনালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং হৃদপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস ধমনিকে শক্ত করে ফেলে এবং রক্তপ্রবাহে সমস্যা তৈরি করে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।
হৃৎপিণ্ডের রক্তনালি রজার লক্ষণ সমূহ
এইসব রোগের সাধারণ লক্ষণ হলো বুকে ব্যথা বা জ্বালা, শ্বাসকষ্ট,
মাথা ঘোরা, ঘাম হওয়া, এবং বাম বাহু বা ঘাড়ে ব্যথা
ছড়িয়ে পড়া। অনেক সময় এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা
করলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে বিশ্রাম নিলে ব্যথা উপশম হয় এবং বুকে ব্যথা না থাকলে ইসিজিতেও তেমন পরিবর্তন দেখা যায় না। যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছে, তাদের অনেকেই এনজাইনার ব্যথা অনুভব করে না।
রক্তনালির ভেতরের লবণের স্তরে হঠাৎ ফাটল ধরলে আক্রান্ত স্থানে দ্রুত রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একে বলা হয় হার্ট অ্যাটাক। রোগীর প্রচণ্ড বুকব্যথা, ঘাম, রক্তচাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয় এবং জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ব্যথা অনেক সময় গলা, চোয়াল, বাঁ হাত বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ কেউ এটিকে বুকে ভীষণ চাপ বা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হিসেবেও অনুভব করে। হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বিশ্রাম নিলেও উপশম হয় না।
হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এমন অনেক কারণ রয়েছে — যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ। এই ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ
করা গেলে হৃদরোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
কি
কি উপায়ে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালি রোগ নির্ণয় করা যায়
করোনারি আর্টারি ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইটিটি (ট্রেডমিল টেস্ট) ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা করোনারি এনজিওগ্রাম। এ পরীক্ষায় ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে জানা যায় হার্টের কোন রক্তনালিতে ব্লক হয়েছে, ব্লকেজের অবস্থান ও পরিমাণ কত। সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়—ঔষধ, স্টেন্ট (রিং) প্রতিস্থাপন অথবা বাইপাস সার্জারি।
হৃদরোগের প্রতিকার শুরু হয় জীবনযাত্রার পরিবর্তনের
মাধ্যমে। ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে
পরিহার করা উচিত। প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করা, সুষম ও কম চর্বিযুক্ত
খাবার খাওয়া, মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের
ওষুধ, রক্ত তরল রাখার ওষুধ, এবং হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বজায় রাখার ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
হৃৎপিণ্ডের
রক্তনালি রোগের চিকিৎসা কি কি
বাইপাস সার্জারি নিয়ে অনেক রোগী ভয় পায়। এটি সত্য, যেকোনো সার্জারির কিছু ঝুঁকি থাকবেই। তবে এখন বাংলাদেশে হার্ট সার্জারি অনেক উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার রোগীর হার্ট সার্জারি দেশেই হচ্ছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যাটি এখনো কম। বর্তমানে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে বুকের ভেতর থেকে দুটি ধমনি—লিমা-রিমা (LIMA-RIMA) বা লিমা-রেডিয়াল (LIMA-RADIAL) ব্যবহার করে বাইপাস সার্জারি করা হচ্ছে, যা রোগীদের দীর্ঘ মেয়াদে সুস্থ থাকতে সাহায্য করছে।
এ ছাড়া মিনিমাল ইনভেসিভ হার্ট সার্জারি এখন বাংলাদেশেও সফলভাবে করা হচ্ছে। এতে ছোট কাটা দিয়ে বুকের এক পাশ দিয়ে অপারেশন করা হয়, যদিও সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। এন্ডোস্কোপিক লেগ ভেইন হারভেস্ট (EVH) পদ্ধতিতেও এখন দেশে এই রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে। এতে রোগীর পায়ে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই মাত্র দু-তিনটি ছোট ফুটোর মাধ্যমে বাইপাস সার্জারির জন্য শিরা সংগ্রহ করা হয়।
যদি রক্তনালি অত্যধিক সংকুচিত হয়ে যায়, তখন আধুনিক চিকিৎসা যেমন অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, বাইপাস সার্জারি বা পেসমেকার
স্থাপন
করা হয়। এই পদ্ধতিগুলো রক্ত
চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
হৃৎপিণ্ডের রক্তনালি রোগের প্রতিকার কি কি
হৃদরোগ প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তচাপ, ব্লাড সুগার এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার
কম খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখাই হৃদপিণ্ডকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার মূল উপায়।
হৃৎপিণ্ডের রক্ত
সঞ্চালন বাধাপ্রাপ্ত করতে
পারে
রক্তনালির সমস্যা। সারা
বিশ্বে
প্রতিবছর লাখো
মানুষের মৃত্যুর কারণ
এটি।
হৃৎপিণ্ডে রক্ত
পৌঁছে
দেওয়ার
মূল
ধমনি
বা
করোনারি আর্টারির সমস্যা
ও
চিকিৎসা নিয়ে
লিখেছেন ডা.মোহাম্মদ রাফিউর রহমান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে কার্ডিওভাসকুলার
ডিজিজে প্রতিবছর প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে বেশির ভাগ মৃত্যুই ঘটে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা হার্ট অ্যাটাকের কারণে। তাই বলা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ার জন্য করোনারি আর্টারি ডিজিজ দায়ী।
উপসংহার
হৃদরোগ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, কিন্তু সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসা গ্রহণ
করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হলো হৃদপিণ্ডকে
সুস্থ
রাখার
সবচেয়ে
কার্যকর
উপায়।










0 comments:
Post a Comment