নবজাতকের জন্ডিস
(Neonatal Jaundice) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা, যা প্রায় প্রতিটি নবজাতকের
মধ্যেই কিছুটা দেখা যায়। সাধারণত জন্মের পর প্রথম সপ্তাহেই অনেক শিশুদের ত্বক ও
চোখের সাদা অংশে হালকা হলুদাভ ভাব দেখা দেয়। একে জন্ডিস বলা হয়। এটি দেখে অনেক
অভিভাবক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কিন্তু সব ধরনের জন্ডিসই বিপজ্জনক নয়। অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা চিকিৎসা ছাড়াই কয়েক
দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ ধারণ করতে পারে এবং শিশুর
জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই নবজাতকের জন্ডিসের কারণ, ধরন ও
প্রতিকার জানা অত্যন্ত জরুরি।
নবজাতকের জন্ডিসের কারণ
নবজাতকের জন্ডিস মূলত
বিলিরুবিন (Bilirubin) নামক এক ধরনের রঞ্জক পদার্থের কারণে হয়ে থাকে। যখন রক্তের
লোহিত কণিকা (Red Blood Cell) ভেঙে যায়, তখন বিলিরুবিন তৈরি হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লিভার এই বিলিরুবিনকে প্রক্রিয়াজাত করে শরীর থেকে
নির্গত করে দেয়। কিন্তু নবজাতকের লিভার সম্পূর্ণ পরিপক্ব না হওয়ায় বিলিরুবিনকে
দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ফলে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায় এবং ত্বক ও
চোখে হলুদাভ ভাব দেখা দেয়।
জন্মের পর শিশুর শরীরে
লোহিত কণিকার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। যখন এই অতিরিক্ত কণিকা ভাঙতে শুরু করে,
তখন বিলিরুবিন উৎপাদনও বাড়ে। অপরদিকে, নবজাতকের লিভার তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায়
অতিরিক্ত বিলিরুবিন বের করতে পারে না। এই প্রক্রিয়ার ফলেই শারীরবৃত্তীয় বা
সাধারণ জন্ডিস দেখা দেয়, যা সাধারণত জন্মের ২-৩ দিন পর শুরু হয় এবং ৭-১০ দিনের
মধ্যে সেরে যায়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস
স্বাভাবিক নয় এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন —
·
রক্তের
গ্রুপের অমিল:
মায়ের ও শিশুর রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হলে (যেমন Rh incompatibility বা ABO
incompatibility) শিশুর রক্তকণিকা দ্রুত ভেঙে যায়, ফলে বিলিরুবিনের মাত্রা দ্রুত
বেড়ে যায়।
·
প্রি-ম্যাচিউর
(অকালজাত) শিশু:
অকালজাত শিশুর লিভার আরও অপরিপক্ব হওয়ায় তারা সহজেই জন্ডিসে আক্রান্ত হয়।
·
সংক্রমণ
(Infection):
জন্মের সময় বা পরে সংক্রমণ হলে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা জন্ডিসের
কারণ হতে পারে।
·
স্তন্যপানজনিত
জন্ডিস:
অনেক সময় মায়ের দুধ খাওয়ানোর অনিয়ম বা দুধে কিছু হরমোনজাতীয় প্রভাবের কারণে
শিশুর জন্ডিস দেখা দিতে পারে, যাকে “Breast milk jaundice” বলা হয়।
নবজাতকের জন্ডিসের লক্ষণ
জন্ডিসের প্রথম লক্ষণ হলো
ত্বক ও চোখের সাদা অংশে হলুদাভ ভাব। শুরুতে এটি মুখ ও চোখে দেখা যায়, পরে ধীরে
ধীরে শরীরের নিচের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। গুরুতর জন্ডিসের ক্ষেত্রে শিশুর
মধ্যে অতিরিক্ত ঘুম, খেতে না চাওয়া, নিস্তেজ ভাব, কান্না কমে যাওয়া, এমনকি
খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। যদি এসব লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ
নেওয়া উচিত।
নবজাতকের জন্ডিসের
পরীক্ষা
শিশুকে পরীক্ষা করার সময় যদি ত্বকের
হলদেভাব চিকিৎসকের নজরে পড়ে, সে ক্ষেত্রে তিনি শিশুর চোখ, মুখ ও বুকের ওপর হালকা
চাপ দিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। হলদেভাব হাত-পায়ের তালুতেও আছে কি না, সেটি দেখেও
জন্ডিস সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়।
চিকিৎসক সাধারণত শিশুর
ত্বকের রঙ দেখে প্রাথমিকভাবে জন্ডিস নির্ণয় করেন। তবে নিশ্চিত হতে বিলিরুবিন টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে
বিলিরুবিনের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়। আধুনিক হাসপাতালে “ট্রান্সকুটেনিয়াস
বিলিরুবিন মিটার” নামক যন্ত্র ব্যবহার করে ত্বকের উপর থেকেই বিলিরুবিন পরিমাপ করা
যায়, যা শিশুর জন্য নিরাপদ ও ব্যথাহীন।
নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা
নির্দিষ্ট মাত্রায় ছড়িয়ে গেলে শিশুর মস্তিষ্কের পর্দা ভেদ করে প্রবেশ
করতে পারে বিলিরুবিন। সেটি হতে পারে মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই
জন্ডিসের ধরন নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জন্ডিস
চিকিৎসায় শিশুকে রোদে দেওয়া সমর্থন করে না। বেশিক্ষণ সময় প্রখর রোদে রাখলে উল্টো
ত্বক রোদে পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জানালার কাচের
মধ্য দিয়ে আসা রোদে অল্প সময় রাখলে নবজাতকের জন্ডিস কিছুটা কমে। এর পাশাপাশি
করণীয়—
মায়ের বুকের দুধ : জন্ডিস সারাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশুকে
ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো। কারণ জন্ডিস হলে শিশুর দেহে ফ্লুইড কমে ডিহাইড্রেশন
হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রোদ লাগানো : প্রতিদিন সকালে রোদে বাচ্চাকে ২০ থেকে ৩০
মিনিট রাখতে হবে। বাচ্চার চোখ, মুখ ও লজ্জাস্থান আড়াল করে বাকি শরীর যত বেশি
উন্মুক্ত রাখা যায়।
ফটোথেরাপি : স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নীল
আলোর নিচে শিশুকে রেখে ফটোথেরাপি দেওয়া হয়। বিলিরুবিন ভেঙে ফেলায় নীল আলো কার্যকর।
ফলে জন্ডিস সেরে যায়।
রক্ত পরিবর্তন : জন্ডিস অনেক বেশি হলে নবজাতকের রক্ত
পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
যা কখনোই করবেন না
আমাদের দেশে জন্ডিস চিকিৎসায় ঘরোয়া বা কবিরাজি চিকিৎসা প্রচলিত।
এগুলো উপকারের চেয়ে ক্ষতি করে বেশি। তাই এসব ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ না করে চিকিৎসকের
পরামর্শমতো চিকিৎসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সঠিক চিকিৎসায় নবজাতকের জন্ডিস
নিরাময়যোগ্য। দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নবজাতকের জন্ডিসের প্রতিকার
অধিকাংশ ক্ষেত্রে
স্বাভাবিক জন্ডিসের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। শিশুকে নিয়মিত
স্তন্যপান করানোই এর প্রধান প্রতিকার। মায়ের দুধ শিশুর শরীর থেকে বিলিরুবিন দ্রুত
নির্গত করতে সহায়তা করে। তাই নবজাতককে ঘন ঘন ও পর্যাপ্তভাবে দুধ খাওয়ানো উচিত।
তবে যদি বিলিরুবিনের
মাত্রা বেশি হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে নিচের চিকিৎসাগুলো দেওয়া যেতে পারে —
1. ফোটোথেরাপি (Phototherapy): এটি জন্ডিসের সবচেয়ে প্রচলিত
চিকিৎসা। শিশুকে বিশেষ নীল আলোয় রাখা হয়, যা ত্বকের মাধ্যমে বিলিরুবিন ভেঙে দেয়
এবং প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে বের হয়ে যায়।
2. এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন (Exchange
Transfusion):
খুব গুরুতর অবস্থায় শিশুর রক্ত পরিবর্তন করে বিলিরুবিনের মাত্রা কমানো হয়।
3. ইনফেকশন চিকিৎসা: যদি জন্ডিসের কারণ সংক্রমণ হয়,
তবে প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
যত্ন ও প্রতিরোধ
·
জন্মের
পর নিয়মিত শিশুর ত্বক ও চোখ পর্যবেক্ষণ করুন।
·
শিশুকে
পর্যাপ্ত স্তন্যপান করান, যেন ডিহাইড্রেশন না হয়।
·
শিশুর
প্রস্রাব ও মলত্যাগের পরিমাণ ঠিক আছে কিনা লক্ষ্য করুন।
·
সূর্যের
হালকা আলো (সকাল ৮টার আগে বা বিকেল ৫টার পর) কিছু সময় শিশুর গায়ে পড়লে তা
বিলিরুবিন কমাতে সহায়তা করে।
·
জন্ডিসের
কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ বা ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার না করে চিকিৎসকের
পরামর্শ নিন।
উপসংহার
নবজাতকের জন্ডিস অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ও অস্থায়ী সমস্যা। তবে সচেতন না হলে এটি জটিল রূপ নিতে পারে
এবং শিশুর মস্তিষ্ক পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যাকে Kernicterus বলা
হয়। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুর জন্মের পর থেকেই সতর্ক থাকা, লক্ষণ দেখা দিলে
দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবস্থা নেওয়া। সঠিক
সময়ে যত্ন ও চিকিৎসা নিলে নবজাতকের জন্ডিস সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য এবং শিশুর
সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।









0 comments:
Post a Comment